ঢাকাশনিবার , ১ অগাস্ট ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য

কার্বন ডাই-অক্সাইড থেরাপিতে কমবে আলঝেইমার রোগের ঝুঁকি

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৪৯ সকাল

Link Copied!

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অভাবনীয় এবং যুগান্তকারী আবিষ্কার সামনে এসেছে। আলঝেইমার বা স্মৃতিভ্রমের মতো জটিল ও নিরাময় অযোগ্য রোগের চিকিৎসায় নতুন আশার সঞ্চার করেছে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা। বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় উচ্চ মাত্রার কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে তা মস্তিষ্কের ভেতরে জমে থাকা আলঝেইমার সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর প্রোটিন বা প্লাকগুলো পরিষ্কার করতে দারুণভাবে সাহায্য করে। গবেষকদের এই দাবি চিকিৎসা জগতের গবেষকদের মধ্যে দারুণ চাঞ্চল্য ও আশার সৃষ্টি করেছে।

আলঝেইমার রোগটি মূলত বার্ধক্যজনিত একটি মারাত্মক স্নায়বিক ব্যাধি, যার কারণে মানুষের স্মৃতিশক্তি ক্রমান্বয়ে লোপ পেতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত রোগী নিজের দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, এই রোগ হওয়ার প্রধান কারণ হলো মস্তিষ্কের কোষগুলোর ভেতরে বা চারপাশে ‘অ্যামাইলয়েড বিটা’ এবং ‘টাউ’ নামক কিছু অস্বাভাবিক প্রোটিনের অস্বাভাবিক জমাট বা প্লাক সৃষ্টি হওয়া। এই প্রোটিনগুলো ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের সুস্থ স্নায়ুকোষ বা নিউরনগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা অচল করে দেয়। দীর্ঘকাল ধরে চিকিৎসকরা এই ক্ষতিকর প্রোটিনগুলো মস্তিষ্ক থেকে দূর করার জন্য নানা ধরনের ওষুধ ও থ নিয়ে গবেষণা করে আসছেন, তবে শতভাগ সফল হওয়া কঠিন ছিল।

সাম্প্রতিক এই নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অভিনব পথ বেছে নিয়েছেন। তারা লক্ষ করেছেন যে, নির্দিষ্ট মাত্রায় কার্বন ডাই-অক্সাইড ইনহেল বা শ্বাস গ্রহণের ফলে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ রক্তপ্রবাহ এবং রক্তনালীর কার্যপ্রণালীতে বিশেষ পরিবর্তন আসে। এর ফলে মস্তিষ্কের নিজস্ব প্রাকৃতিক বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা—যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম’ বলা হয়—অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। মূলত ঘুমের সময় বা নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থায় এই সিস্টেমটি মস্তিষ্ক থেকে ময়লা ও বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করার কাজ করে। উচ্চ মাত্রার কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণের ফলে এই প্রক্রিয়াটি বহুগুণ দ্রুততর হয় এবং মস্তিষ্ক থেকে আলঝেইমার রোগের জন্য দায়ী ক্ষতিকর প্রোটিনগুলো বাইরে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়।

গবেষকরা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে দেখেছেন যে, এই থেরাপি প্রয়োগের ফলে মস্তিষ্কের জমাট বাঁধা প্রোটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। এটি কেবল আলঝেইমার রোগীদের ক্ষেত্রেই নয়, বরং অন্যান্য নিউরোডিজেনারেটিভ বা স্নায়বিক অবক্ষয়জনিত রোগের চিকিৎসায়ও একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। সাধারণত কার্বন ডাই-অক্সাইড বলতেই আমরা ক্ষতিকর বা বিষাক্ত গ্যাস হিসেবে বুঝি, যা মানবদেহের জন্য হুমকিস্বরূপ। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই গবেষণায় এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, চিকিৎসকের কঠোর তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত নিখুঁত ও নিরাপদ মাত্রায় এই গ্যাস ব্যবহার করলে তা শরীরের জন্য বিপরীত বা ইতিবাচক সুফল বয়ে আনতে পারে।

অবশ্য গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, এই পদ্ধতিটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর এর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু করতে আরও বহু ধাপ পার হতে হবে। মানুষের শরীরের ওপর এর কোনো দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা, কিংবা কোন বয়সে বা কতমাত্রায় এটি প্রয়োগ করা নিরাপদ—তা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানবদেহে পরীক্ষা চালানো প্রয়োজন। তা সত্ত্বেও, আলঝেইমার রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই আবিষ্কার এক বিশাল বিপ্লব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এই রোগের ঝুঁকি বেড়েই চলে, যা কেবল রোগীর নিজের জন্যই নয়, বরং তার পরিবার ও পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর এক বিরাট মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘকাল ধরে এই রোগের কার্যকরী কোনো ওষুধ বা প্রতিকার না থাকায় চিকিৎসকরা কেবল লক্ষণ কমানোর ওপর জোর দিয়ে আসছিলেন। এমন একটি হতাঞ্জক পরিস্থিতিতে উচ্চ মাত্রার কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি মূল ক্ষতিকর প্রোটিন ধ্বংস করার এই ধারণা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বিজ্ঞানের এই চমৎকার উৎকর্ষ প্রমাণ করে যে মানব শরীরের অজানা রহস্য ভেদ করে জটিল থেকে জটিলতর রোগের নিরাময় খুঁজে পাওয়া সম্ভব। গবেষকদের পরবর্তী ধাপের কাজ সফল হলে অদূর ভবিষ্যতে আলঝেইমার রোগীদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন, ওষুধবিহীন এবং অধিক কার্যকর এই থেরাপি আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেবে। অন্ধকারাচ্ছন্ন স্মৃতিভ্রষ্ট জীবনের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে রোগীরা হয়তো ফিরে পাবেন তাদের সোনালী দিনগুলো, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে চিরকাল স্মরণে থাকবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

ক্যান্সার গবেষণায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেন ড. আবু আলী সিনা

খুলনায় ট্রাকচাপায় একই পরিবারের ৩ জন নিহত

বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ ও বন্যার ঝুঁকি বাড়াবে এল নিনো: ডব্লিউএমও

দুপুরের মধ্যে ৭ অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা

ADB Appoints New Country Director for Bangladesh

বাংলাদেশের জন্য নতুন কান্ট্রি ডিরেক্টর নিয়োগ দিল এডিবি

বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের পাশে বিএমএসসি

সন্ধ্যার মধ্যে ৭ অঞ্চলে ঝড়ের আশঙ্কা

তীব্র গরমে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি ১.৮ বিলিয়ন ডলার: বিশ্বব্যাংক

পরিবহনে ধূমপান ও নেশা জাতীয় দ্রব্য বহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করল বিআরটিসি

640 Public Transport Drivers Trained Under BRTA and DAM Initiative

বিআরটিএ ও ডামের উদ্যোগে ৬৪০ গণপরিবহন চালককে প্রশিক্ষণ