
ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ, মশার কামড় থেকে সুরক্ষা এবং জ্বর হলে ঘরে বসে না থেকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন বা সুনির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় সচেতনতা এবং এডিস মশা নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
শনিবার (১ আগস্ট) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ আমাদের বাড়ির ভেতর-বাইরে, ছাদে এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে তৈরি হয়। তাই সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা। এজন্য বাড়ির আঙিনা ও আশপাশ সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পাত্র, কৌটা, টায়ার বা যেখানে পানি জমে থাকতে পারে, সেগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। পাশাপাশি ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, এয়ার কন্ডিশনার ও রেফ্রিজারেটরের নিচের পানির ট্রেসহ ব্যবহারযোগ্য পাত্রে যেন একটানা পাঁচ দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৮ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ১৪ হাজার ১৫৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ পর্যন্ত মোট ১৭ হাজার ৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়েছেন।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু হাসপাতালে নয়, মানুষের বাড়ি, বিদ্যালয়, কর্মস্থল এবং স্থানীয় জনসমাজ থেকেই শুরু করতে হবে। রোগী দ্রুত শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়া, দরিদ্র রোগীদের সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু ও ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, বৃষ্টিকে যদি শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তবে বৃষ্টির পরপরই যদি মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে প্রতিবছরের ডেঙ্গু সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান হাফিজুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে শরীরের তাপমাত্রা ১০২ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। এ সময় মাথায় পানি দেওয়া ও শরীর মুছে জ্বর কমানোর চেষ্টা করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ছয় থেকে আট ঘণ্টা পরপর প্রয়োজন হলে প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের মূল চিকিৎসা হলো শরীরে পর্যাপ্ত তরল বজায় রাখা। এজন্য প্রচুর পানি পান করার পাশাপাশি ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস, স্যুপ ও অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে।
ডা. হাসান হাফিজুর রহমান আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূলমন্ত্র হলো এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। এডিস মশা পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। তাই বাড়ির আশপাশ, ছাদ, ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় এবং পানি জমার স্থান নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং প্রয়োজনীয় মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, পানি জমতে না দেওয়া এবং জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার ও মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।