ঢাকাসোমবার , ২৫ মে ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. নিরাপদ খাদ্য

প্যাকেটজাত খাবারেই মরণফাঁদ

প্রতিবেদক
admin
২ এপ্রিল ২০২৬, ৩:১৫ অপরাহ্ণ

Link Copied!

# অতি-প্রসেসড খাবারে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি ৪৭ শতাংশ বাড়ছে

# চিপস-সসেজ-কোমল পানীয় ধমনীতে প্রদাহ সৃষ্টি করে ব্লকেজ বাড়াচ্ছে

# রক্তে প্রোটিন বৃদ্ধিতে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে প্যাকেটজাত খাবার

# অতিরিক্ত লবণ ও ট্রান্স-ফ্যাট উচ্চ রক্তচাপ এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ায়

# দেশের ৯৭ শতাংশ প্যাকেটজাত খাবার বর্তমানে উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়

# আগ্রাসী বিপণন ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিশুরা ঘাতক খাবারে আসক্ত হচ্ছে

# প্যাকেটজাত খাবারে শিশুদের স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রধান কারণ

# প্রাকৃতিক পুষ্টির অভাবে তরুণ প্রজন্মের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে

 

এক দশক আগেও আমাদের খাদ্যাভ্যাস ছিল মূলত রান্নাঘর কেন্দ্রিক। কিন্তু দ্রুতগতির আধুনিক জীবন আর শিল্পায়নের যুগে মানুষের ডাইনিং টেবিল দখল করে নিয়েছে রঙিন মোড়কের প্যাকেটজাত খাবার। সহজলভ্য আর সুস্বাদু এই খাবারগুলোই যে আসলে মানবদেহের হৃদযন্ত্রের জন্য এক মরণফাঁদ পেতে রেখেছে, তার প্রমাণ মিলল সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক বৈশ্বিক গবেষণায়।

বিশেষ করে গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক সমন্বিত মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত অতি-প্রসেসড ফুড যেমন: প্যাকেটজাত চিপস, চকোলেট, কোমল পানীয় বা ফ্রোজেন খাবার খান, তাদের হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি।

গবেষকরা বলছেন, এই ঝুঁকি এখন আর কেবল বয়স্কদের জন্য সীমাবদ্ধ নেই, বরং তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি এক ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

গবেষণার সারসংক্ষেপ

চিকিৎসা বিজ্ঞানের শীর্ষ সাময়িকী ‘দ্য আমেরিকান জার্নাল অব মেডিসিন’ এবং ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অতি-প্রসেসড খাবারের এই ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছিলেন। ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত পরিচালিত বেশ কয়েকটি ফলো-আপ গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এই ভয়াবহ ঝুঁকির বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি ‘দ্য আমেরিকান জার্নাল অব মেডিসিন’-এ প্রকাশিত সর্বশেষ গবেষণায় ৪ হাজার ৭৮৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দীর্ঘমেয়াদী খাদ্যাভ্যাস এবং তাদের কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ড. চার্লস এইচ. হেনেকেন্স গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখেছি যে, যারা তাদের প্রতিদিনের মোট ক্যালোরির একটি বড় অংশ অতি-প্রসেসড খাবার থেকে গ্রহণ করেন, তাদের কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় অর্ধেক (৪৭ শতাংশ) বেড়ে যায়। এমনকি যারা ধূমপান করেন না বা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাদের ক্ষেত্রেও এই খাবারের ক্ষতিকর প্রভাব সমানভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।’

অতি-প্রসেসড খাবার আসলে কোনগুলো?

অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না যে কোন খাবারগুলো আমাদের হার্টকে ঝুঁকিতে ফেলছে। গবেষণায় অতি-প্রসেসড খাবারের একটি নির্দিষ্ট তালিকা দেওয়া হয়েছে। এগুলো মূলত কলকারখানায় একাধিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় এবং এতে এমন সব উপাদান থাকে যা সাধারণ রান্নাঘরে থাকে না।

প্যাকেটজাত স্ন্যাকস: চিপস, কুড়মুড়ে চানাচুর, পটেটো ক্র্যাকার্স বা নিমকি। মিষ্টিজাতীয় খাবার: ইন্ডাস্ট্রিয়াল চকোলেট, ক্যান্ডি, প্যাকেটজাত কেক, বিস্কুট, ডোনাট এবং পেস্ট্রি। কোমল পানীয়: কার্বোনেটেড বেভারেজ, কোল্ড ড্রিংকস, কৃত্রিম ফ্লেভারড জুস এবং এনার্জি ড্রিংক। ইনস্ট্যান্ট ফুড: ইনস্ট্যান্ট নুডলস, স্যুপের প্যাকেট এবং পাস্তা। প্রসেসড মিট: সসেজ (মাংসের স্টিক), নাগেটস (মাংসের বড়া বা চিকেন চপ), সালামি (মাংশের চাকা যা স্যান্ডউইচের মধ্যে বা পিৎজার ওপরে থাকে ) এবং হট ডগ (মিট স্যান্ডউইচ বা লম্বা রুটির মাংসের রোল)। রেডি-টু-ইট মিল: ফ্রোজেন পিৎজা, বার্গার এবং ফ্রিজে রাখা হয় এমন আগে থেকে তৈরি করা খাবার।

এই খাবারগুলো খেলে ভেতরে কী ঘটে?

গবেষকরা অতি-প্রসেসড খাবারের ধ্বংসাত্মক প্রভাবকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই খাবারগুলো শরীরে প্রবেশের পর কয়েকটি প্রধান উপায়ে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে:

ধমনীতে ভয়াবহ প্রদাহ: এই খাবারগুলোকে আকর্ষণীয় রঙ, স্বাদ এবং দীর্ঘস্থায়ী করতে যে ইমালসিফায়ার, প্রিজারভেটিভ এবং কৃত্রিম সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়, সেগুলো শরীরের কোষের জন্য অপরিচিত। রক্তে এগুলো মেশার পর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এগুলোকে ‘বহিরাগত আক্রমণকারী’ মনে করে। ফলে রক্তনালীর ভেতরে এক ধরণের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয়। এই প্রদাহ ধমনীর দেয়ালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সেখানে চর্বি জমতে সাহায্য করে, যা পরে ব্লকে পরিণত হয়।

সি-রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিন বৃদ্ধি: গবেষণার প্রধান লেখক ড. হেনেকেন্স দেখিয়েছেন, অতি-প্রসেসড খাবার রক্তে ‘হাই সেনসিটিভ সি-রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিন’ বা এইচএস-সিআরপি-এর মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রোটিনটিকে হৃদরোগের অন্যতম বড় পূর্বাভাস হিসেবে ধরা হয়। রক্তে এর উপস্থিতি মানেই হলো আপনার হৃদযন্ত্র এবং রক্তনালীতে বড় ধরণের অস্থিরতা চলছে, যা যে কোনো মুহূর্তে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক ঘটাতে পারে।

বিপাকীয় বিপর্যয় ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: অতি-প্রসেসড খাবারে থাকে উচ্চমাত্রার পরিশোধিত চিনি এবং ট্রান্স-ফ্যাট। এগুলো শরীরে প্রবেশের পর ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যাকে ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ বলা হয়। এটি কেবল ডায়াবেটিসের ঝুঁকিই বাড়ায় না, বরং হার্টের পেশিকে দুর্বল করে দেয়।

লবণের বিষক্রিয়া ও উচ্চ রক্তচাপ: প্যাকেটজাত খাবার সুস্বাদু রাখতে এতে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম বা লবণ ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি প্যাকেটজাত চিপস বা নুডলসে যে পরিমাণ লবণ থাকে, তা একজন মানুষের সারাদিনের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। অতিরিক্ত সোডিয়াম সরাসরি রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদপিণ্ডকে রক্ত পাম্প করতে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে হার্ট ফেইলিউরের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট : ঘরে ঘরে ঘাতক খাবারের বিস্তার

আন্তর্জাতিক এই গবেষণার ভয়াবহতা যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে, তখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেশের বর্তমান খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এক দশক আগেও বাংলাদেশে মানুষের খাদ্যাভ্যাস মূলত ঘরোয়া ও প্রাকৃতিক খাবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল কিন্তু গত এক দশকের মধ্যে শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত প্যাকেটজাত ও অতি-প্রসেসড খাবারের বাজার আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মূলত দেশীয় স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক সমীক্ষা, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী পাঁচটি প্রধান কারণে দেশের সাধারণ মানুষ এখন ভয়াবহ হৃদঝুঁকির মুখে রয়েছে।

নগরায়ন ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন
দ্রুত নগরায়ন এবং কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বাড়ার ফলে ‘রেডি-টু-ইট’ বা ঝটপট খাবারের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সকালের নাস্তা কিংবা বিকেলের নাস্তায় এখন ঘরে তৈরি খাবারের বদলে জায়গা করে নিয়েছে প্যাকেটজাত বিস্কুট, পাউরুটি এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস। অনেক ক্ষেত্রে সময় বাঁচাতে অভিভাবকরা শিশুদের টিফিনে হাতে তৈরি নাস্তার বদলে প্যাকেটজাত নুডলস বা জুস দিচ্ছেন, যা অজান্তেই তাদের হৃদপিণ্ডের অপূরণীয় ক্ষতি করছে।

আগ্রাসী বিপণন ও শিশুদের আসক্তি
বাংলাদেশে অতি-প্রসেসড খাবারের প্রসারের পেছনে বড় কারণ হলো কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী বিপণন কৌশল। বিশেষ করে শিশুদের লক্ষ্য করে তৈরি করা মুখরোচক বিজ্ঞাপন এবং উপহারের প্রলোভন শিশুদের এই খাবারে আসক্ত করে তুলছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই খাবারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় (লবণ, চিনি ও টেস্টিং সল্টের মিশ্রণে), যা মস্তিষ্কে এক ধরণের সাময়িক আনন্দ দেয়। ফলে শিশুরা একবার এই স্বাদ পেলে বাড়িতে তৈরি পুষ্টিকর খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা ও তথ্যের লুকোচুরি
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের (এনএইচএফবি) একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের বাজারে থাকা প্যাকেটজাত খাবারের প্রায় ৯৭ শতাংশই উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে মোড়কের গায়ে ‘পুষ্টিগুণ’ বা ‘লবণের মাত্রা’ সংক্রান্ত যে তথ্য দেওয়া থাকে, ল্যাবে পরীক্ষার পর তার সত্যতা পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ‘সুগার ফ্রি’ বা ‘লো ফ্যাট’ দাবি করা অনেক খাবারেও হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর কেমিক্যালের উপস্থিতি মিলেছে।

প্রান্তিক পর্যায়ে অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ
এক সময় হার্ট অ্যাটাক বা উচ্চ রক্তচাপকে কেবল ‘ধনী মানুষের রোগ’ মনে করা হতো। কিন্তু এখন অতি-প্রসেসড খাবারের সহজলভ্যতার কারণে গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যেও এই রোগগুলো ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রামের মানুষ এখন তাজা ফলের বদলে পাঁচ-দশ টাকার কৃত্রিম জুস বা রঙিন পানীয় পান করছে। এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অকাল হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের শিকার হচ্ছে, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

লবণের অলক্ষ্য উপস্থিতি
বাঙালিদের খাদ্যাভ্যাসে এমনিতেই লবণের ব্যবহার বেশি। তার ওপর প্যাকেটজাত খাবারে সুস্বাদু করার জন্য যে বিপুল পরিমাণ সোডিয়াম দেওয়া হয়, তা মানুষের প্রতিদিনের লবণের চাহিদাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, এই বাড়তি লবণই মূলত বাংলাদেশের উচ্চ রক্তচাপ ও অকাল হার্ট অ্যাটাকের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এনএইচএফবি-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, দেশে বাজারজাতকৃত প্যাকেটজাত খাবারের প্রায় ৯৭ শতাংশই উচ্চ স্বাস্থ্য ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে ৬৩ শতাংশ খাবারে লবণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, দেশে বর্তমানে প্রায় ২১ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনে ভুগছেন এবং এর একটি বড় কারণ হলো এই প্যাকেটজাত খাবার।

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, আমরা বর্তমানে এক ধরণের খাদ্য-বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের তরুণদের মধ্যে অকাল হার্ট অ্যাটাকের হার বেড়ে যাওয়ার প্রধানতম কারণ হলো অতি-প্রসেসড খাবার এবং শরীরচর্চার অভাব। মানুষ এখন বাড়ির রান্নার চেয়ে প্যাকেট খোলা খাবার বেশি পছন্দ করছে, যা তাদের ধমনীকে ধীরে ধীরে পাথর করে ফেলছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সাবেক চেয়ারম্যান মো. আব্দুল কাইউম সরকার জানান, দেশে অনেক প্যাকেটজাত খাবারের গায়ে পুষ্টিমান বা উপাদানের সঠিক তথ্য লেখা থাকে না। লবণের পরিমাণ আড়াল করা হয়, যা সাধারণ মানুষের অজান্তেই তাদের রক্তচাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর বলেন, অতি-প্রসেসড খাবার বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য তিনটি ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রথমত, এসব খাবারে ব্যবহৃত কৃত্রিম প্রিজারভেটিভ ও কেমিক্যাল হৃদরোগের পাশাপাশি মরণব্যাধি ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এটি আমাদের শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে এক নীরব বিপর্যয় ডেকে আনছে; টিফিনে দেওয়া চিপস বা কৃত্রিম জুস তাদের স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক খাবারের বদলে এসব প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা তরুণ প্রজন্মের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তার মতে, এখনই সচেতন না হলে এই ‘খাদ্য-সংস্কৃতি’ আগামীর সুস্থ প্রজন্ম গড়ার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

কেন এই খাবারের প্রতি আসক্তি?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অতি-প্রসেসড খাবারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে মানুষ এতে আসক্ত হয়ে পড়ে। এতে থাকা অতিরিক্ত চিনি এবং ‘মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট’ (টেস্টিং সল্ট) মস্তিষ্কের ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়, যা মানুষকে বারবার এই খাবার খেতে প্রলুব্ধ করে। এক প্যাকেট চিপস বা একটি কোমল পানীয় খাওয়ার পর কিছুক্ষণ তৃপ্তি মিললেও, তা শরীরের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে চলে।

বর্তমান বাজার ও বিপণন কৌশল
বাংলাদেশে অতি-প্রসেসড খাবারের প্রসারের পেছনে আগ্রাসী বিপণন কৌশল বড় ভূমিকা রাখছে। শিশুদের কার্টুন চ্যানেলে বা ইউটিউব ভিডিওর মাঝে চিপস ও চকোলেটের মুখরোচক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। ফলে শিশুরা শৈশব থেকেই এই ঘাতক খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাকজাত পণ্যের মতো এই ক্ষতিকর খাবারগুলোর বিজ্ঞাপনেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন।

জীবন রক্ষায় সুপারিশমালা

অতি সম্প্রতি এই আন্তর্জাতিক গবেষণা কেবল আমাদের সতর্কই করেনি, বরং সমাধানের পথও বাতলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা হৃদরোগ থেকে বাঁচতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। যেগুলোমেনে চলার ওপর জোরও দেওয়া হয়েছে।

প্যাকেটজাত খাবারের বদলে শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম এবং বাড়িতে তৈরি সাধারণ খাবারে ফিরে যেতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যান্টিনে প্যাকেটজাত চিপস, নুডলস বা কোমল পানীয় বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে। পরিবারে মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে যাতে শিশুদের টিফিনে অস্বাস্থ্যকর প্যাকেটজাত খাবার না দেওয়া হয়। কোমল পানীয় বা প্যাকেটজাত জুসের বদলে ডাব, লেবুর শরবত বা সাধারণ পানি পানের অভ্যাস করতে হবে এবং সরকারের উচিত প্রতিটি প্যাকেটের গায়ে লবণের মাত্রা অনুসারে লাল বা সবুজ সংকেত ব্যবহার নিশ্চিত করা, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে কোন খাবারটি ঝুঁকিপূর্ণ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর পরিচালক (সিএম) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্যাকেটজাত খাবারে লবণের আধিক্য জনস্বাস্থ্যের জন্য বর্তমানে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ল্যানসেটের গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষের দৈনিক ৫ গ্রাম লবণের প্রয়োজন থাকলেও আমরা গড়ে ১০ গ্রামের বেশি গ্রহণ করছি। বিশেষ করে প্যাকেটজাত চিপস বা স্ন্যাকসগুলোতে মোড়কের তথ্যের চেয়েও বেশি লবণ থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, যা উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, বিএসটিআই মূলত একটি সার্টিফাইং অথরিটি হিসেবে বিশেষজ্ঞ কমিটির নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী পণ্য যাচাই করে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা বড় কোম্পানিগুলোকে সাধারণ লবণের পরিবর্তে ‘লো-সোডিয়াম সল্ট’ বা পটাশিয়াম যুক্ত লবণ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কোম্পানিগুলোকে কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত। যদিও এতে উৎপাদন খরচ কেজিতে ৫-৬ টাকা বাড়তে পারে, তবুও জনস্বার্থে এটি জরুরি। এছাড়া হার্ট ফাউন্ডেশনও এ ধরনের স্বাস্থ্যসম্মত পণ্যের প্রসারে আমাদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী।’

কেবল আইন দিয়ে নয়, বরং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘পাতে বাড়তি লবণ খাওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে গণমাধ্যমকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। চিনি ও লবণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি না হলে অসংক্রামক ব্যাধির এই প্রকোপ কমানো কঠিন হবে।’

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

রবি এলিট প্রোগ্রামে আরও ১৬ ব্র্যান্ড, মিলবে ৫২% পর্যন্ত ছাড়

With 16 New Brands, Robi Elite Offers Up To 52% Discount

অপো এ সিরিজকে নম্বর ১ স্মুথনেস, ব্যাটারি লাইফ ও ডিউরেবিলিটির স্বীকৃতি দিলো বুয়েট

Universal Birth-Death Registration Accelerates SDGs

শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এসডিজি অর্জনে সহায়ক

ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ‘ভূমি দৃষ্টি’ অ্যাপ চালু হচ্ছে: প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

প্রকৃতি ও জীব-বৈচিত্র্য বেঁচে থাকলে আমরাও বাঁচব- জীব-বৈচিত্র্য দিবসে বক্তারা

Apex Footwear introduces ‘Buy Online, Pick-up in Store’ (BOPIS) service ahead of Eid ul-Azha

ঈদে ক্রেতাদের সুবিধায় ‘এক্সপ্রেস ডেলিভারি’ ও ‘পিকআপ’ সেবা চালু করল এপেক্স

Recommendation to ban unfit Motor vehicles for safe Eid travel

নিরাপদ ঈদযাত্রায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধের সুপারিশ

bdtickets Launches Round-Trip Bus Ticketing for Eid Travelers