রমজানের শুরু থেকে জেলার মাঠে মাঠে আলু তোলার ধুম পড়েছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষিপ্রধান জেলা জয়পুরহাট–এ নারী শ্রমিকরা মাটির বুক চিরে তুলে আনছেন নতুন মৌসুমের আলু। প্রতি শতকে বিভিন্ন জাতের আলু চার থেকে সাড়ে চার মণ পর্যন্ত ফলন হচ্ছে। ফলন ভালো হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না থাকায় কৃষকদের চোখে-মুখে এখন গভীর উদ্বেগ।
বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, আলু পরিপক্ব হওয়ায় কৃষকেরা তুলতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় অনেকেই তা বিক্রি না করে রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখছেন। বিক্রির প্রসঙ্গ উঠলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন তারা।
কৃষকদের হিসাবে, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে সার, বীজ, সেচ, নিড়ানি ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। অথচ বর্তমান বাজারদরে প্রতি বিঘার আলু বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিঘাপ্রতি লোকসান গুনতে হচ্ছে ২০ হাজার টাকারও বেশি।
স্থানীয় বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাদা জাতের ডায়মন্ড ও লাল স্টিক আলু প্রতি মণ (৪০ কেজি) ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গ্যানোলা জাতের আলুর দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। কয়েকদিন আগেও এক মণ আলু ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে জানান চাষিরা। আকস্মিক এ দরপতনের কারণ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। কেউ সিন্ডিকেটের প্রভাবের কথা বলছেন, কেউবা চাহিদা কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন।
কালাই উপজেলার সড়াইল মাঠে আলু তুলতে থাকা কৃষক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “কয়েকদিন আগেও ৬০০ টাকায় আলু বিক্রি করেছি। আজ সেই আলু ২০০-২২০ টাকায় নামতে হয়েছে। হিমাগারগুলোতে আলু তোলার সময়েও দাম কমছে। আমরা কৃষকরা এখন কোথায় যাব?”
একই মাঠের কৃষক আব্দুল লতিফ বলেন, “সরকারকে দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতে হবে। এভাবে লোকসান হলে চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।”
সবজি রফতানিকারক আব্দুল বাসেদ জানান, আগের বছরগুলোতে প্রচুর আলু রফতানি হলেও এবার কার্যত রফতানি শুরু হয়নি। তিনি বলেন, আগে রফতানিতে ২০ শতাংশ প্রণোদনা থাকলেও এখন তা কমে ১০ শতাংশ হয়েছে, ফলে রফতানি কমে গেছে।
জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি–র সভাপতি আনোয়ারুল হক বলেন, সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। এতে আলু প্রক্রিয়াজাত ও রফতানি সহজ হবে এবং কৃষকেরাও ন্যায্যমূল্য পাবেন।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর–এর উপ-পরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম জানান, এ বছর জেলায় ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। তিনি বলেন, আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। একই সঙ্গে সরকারও রাজস্ব আয় বাড়াতে পারবে।
ফলন ভালো হলেও দামের অস্থিরতায় দিশেহারা জয়পুরহাটের কৃষকরা এখন সরকারের হস্তক্ষেপ ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার অপেক্ষায় রয়েছেন।


