ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • অন্যান্য

ভারী বৃষ্টি ও তীব্র ঠান্ডায় গাজায় বাস্তুচ্যুতদের দুর্ভোগ চরমে

নিজস্ব প্রতিবেদক
ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫ ৪:০৩ অপরাহ্ণ । ১৬৪ জন

শীতকালীন ঝড় ‘বায়রন’-এর প্রভাবে সৃষ্ট ভারী বৃষ্টিপাত ও তীব্র ঠান্ডায় গাজা উপত্যকায় বসবাসরত বাস্তুচ্যুত লাখো ফিলিস্তিনি চরম মানবিক সংকটে পড়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে এবং ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

ইউনিসেফের মুখপাত্র জোনাথন ক্রিক্স বিবিসিকে জানান, রাতের আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। বৃষ্টিপাত এতটাই তীব্র ছিল যে তিনি তার অফিসের আশপাশে প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার (ছয় ইঞ্চি) পর্যন্ত পানি জমে থাকতে দেখেছেন। তার ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকা মানুষদের জন্য রাত কাটানো ছিল অত্যন্ত কষ্টকর।

তিনি বলেন, অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাসরত শিশুরা ভেজা কাপড়েই থাকতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে তাদের হাইপোথারমিয়া এবং অন্যান্য ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। শিশুদের জীবন এই মুহূর্তে মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।

এদিকে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঝড় বায়রনের কারণে আশ্রয়কেন্দ্র ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অনেক ভবন আগে থেকেই ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, ফলে ভারী বৃষ্টি ও বাতাসে সেগুলো ধসে পড়ছে। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি স্থানে বাড়িঘর ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার হাইপোথারমিয়ায় একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ভয়াবহ আবহাওয়ার কারণে ভবন ধসে অন্তত ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

ফিলিস্তিনের স্বরাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় জানায়, বুধবার ভোর থেকে টানা বৃষ্টির ফলে গাজার বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের তাঁবু পানিতে তলিয়ে গেছে। এর ফলে ইসরায়েলের টানা দুই বছরের সামরিক অভিযানে বাস্তুচ্যুত প্রায় ৮ লাখ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার পরিবার বৃষ্টিপাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের আশ্রয়স্থল ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নষ্ট বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। গত সোম ও মঙ্গলবারের ভারী বৃষ্টিতে অন্তত ৪০টির বেশি নির্ধারিত জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র মারাত্মকভাবে প্লাবিত হয়, ফলে বহু মানুষকে আবারও স্থানান্তরিত হতে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এক বিবৃতিতে জানায়, ভারী বৃষ্টিপাতে শত শত আশ্রয় শিবির প্লাবিত হয়েছে এবং মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিও খুব দ্রুত বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

আইওএম জানায়, গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি শুরুর পর গাজায় এক মিলিয়নেরও বেশি আশ্রয় সামগ্রী পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জলরোধী তাঁবু, তাপীয় কম্বল, ঘুমানোর মাদুর ও ত্রিপল। তবে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এসব সামগ্রী দীর্ঘস্থায়ী বন্যা বা টানা ভারী বৃষ্টির চাপ সহ্য করতে সক্ষম নয়।

ইউনিসেফের যোগাযোগ প্রধান জোনাথন ক্রিক্স বিবিসির টুডে প্রোগ্রামে বলেন, ‘গত রাতটি পরিবারগুলোর জন্য ছিল সত্যিই ভয়াবহ। বৃষ্টি এতটাই তীব্র ছিল যে আমাদের অফিস ও আবাসস্থলের আশপাশে ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পানি জমেছিল। সঙ্গে ছিল প্রবল বাতাস।’

তিনি আরও জানান, সকালে গাড়ি চালানোর সময় তিনি দেখেছেন, অনেক মানুষ বালতি দিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র ও তাঁবু থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছে। প্রায় ১০ লাখ মানুষ তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছে, যাদের অধিকাংশই গত দুই বছরে বহুবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং তাদের কাছে অতিরিক্ত পোশাক বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রায় নেই।

এদিকে ফিলিস্তিনি মেডিকেল রিলিফ সোসাইটি জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টিতে তাদের অন্তত চারটি মেডিকেল পয়েন্ট প্লাবিত হয়েছে। এতে চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষতি হয়েছে এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা ও জরুরি মানবিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে গাজার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আরও প্রাণহানি রোধ করা যায়।

সূত্র: বিবিসি, আলজাজিরা