
বাঘ পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। একসময় এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাঘের বিচরণ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বন উজাড়, অবৈধ শিকার এবং মানুষের অনুপ্রবেশের কারণে বিগত শতকে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশ বাঘ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার ফলে কিছু দেশে বাঘের সংখ্যা পুনরায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বাঘ রয়েছে ভারত, রাশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়।
ভারত বিশ্বের বাঘ সংরক্ষণে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ২০২২ সালে দেশটিতে বাঘের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩,১৬৭টি, যা বিশ্বের মোট বাঘের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। ভারতের “প্রজেক্ট টাইগার” কর্মসূচি ১৯৭৩ সালে শুরু হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বাঘের আবাসস্থল রক্ষা, অবৈধ শিকার প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার ফলেই ভারতের বাঘের সংখ্যা গত দুই দশকে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া, যেখানে ৫৭৩টি বাঘের বসবাস। মূলত সাইবেরিয়ার কঠিন শীতল অরণ্যে এই ‘সাইবেরিয়ান টাইগার’ বা ‘আমুর টাইগার’-এর দেখা মেলে। সোভিয়েত আমল থেকেই রাশিয়া বাঘ সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রণয়ন করে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশেষ রিজার্ভ তৈরি করে। এর ফলে একসময় প্রায় বিলুপ্তির পথে থাকা এই প্রজাতি এখন তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় ২০২২ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ৩৯৩টি। দেশটিতে কেবলমাত্র ‘সুমাত্রান টাইগার’ প্রজাতিটি টিকে আছে। তবে দ্রুত বন উজাড় এবং কৃষি সম্প্রসারণের কারণে এই প্রজাতি এখনও ঝুঁকির মুখে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো বাঘ সংরক্ষণের জন্য সুরক্ষিত বনাঞ্চল ও প্রজননকেন্দ্র স্থাপন করেছে।
চতুর্থ স্থানে রয়েছে নেপাল, যেখানে বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৬টি। দক্ষিণ এশিয়ায় বাঘ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নেপালের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। দেশটি সীমান্তবর্তী সংরক্ষিত অরণ্য যেমন চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক ও বারদিয়া ন্যাশনাল পার্কে বাঘের সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
পরবর্তী অবস্থানে আছে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভুটান, বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমার। থাইল্যান্ডে ১৮৯টি, মালয়েশিয়ায় ১৫০টি, ভুটানে ১৩১টি, বাংলাদেশে ১১৮টি, চীনে ৬০টি এবং মিয়ানমারে ২৮টি বাঘ রয়েছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চল এশিয়ার বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার এখনো টিকে আছে। সরকারের ‘বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও বনাঞ্চল ধ্বংস এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বাঘ কেবল একটি প্রাণী নয়, এটি একটি দেশের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রতীক। বাঘের উপস্থিতি নির্দেশ করে সেই দেশের বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের সক্ষমতা। তাই ভারত থেকে বাংলাদেশ, রাশিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া—সব দেশকেই বাঘ সংরক্ষণকে জাতীয় অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। কারণ, একটি বাঘ বাঁচানো মানে একটি সমগ্র বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা, যা মানবজীবনেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।