
বিশ্ব ইতিহাসে সামরিক ব্যয় সবসময়ই একটি দেশের রাজনৈতিক প্রভাব, নিরাপত্তা কৌশল ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে সম্পর্কিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী শীতল যুদ্ধের সময়কাল পর্যন্ত প্রতিটি পর্বে সামরিক ব্যয়ের ধারা নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। যার ফলে গড়ে উঠেছে নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো—বিশেষ করে ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স ও রাশিয়া—তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট দ্রুত বাড়াতে থাকে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে নৌবাহিনী শক্তিশালী করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যা “Dreadnought race” নামে পরিচিত। ১৯১৪ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ইউরোপের প্রায় সব প্রধান শক্তিই তাদের মোট বাজেটের বিশাল অংশ সামরিক খাতে ব্যয় করছিল। যুদ্ধ চলাকালে ব্রিটেন ও জার্মানির মতো দেশগুলো তাদের জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সামরিক কাজে ব্যবহার করে। এই ব্যাপক ব্যয় ইউরোপীয় অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে ফেলে এবং যুদ্ধোত্তর মন্দার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক ব্যয় এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি, জাপান ও ব্রিটেন—এই পাঁচ শক্তিই যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যে বিশাল শিল্প ও মানবসম্পদ সামরিক উৎপাদনে নিয়োজিত করে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শেষ দিকে তার মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করে, যা ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক উদ্যোগ।
এসময় জার্মানি ও জাপানের সামরিক ব্যয়ও সমান হারে বেড়ে যায়। যদিও শেষ পর্যন্ত তাদের অর্থনীতি যুদ্ধের চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই সামরিক ব্যয় বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত উন্নয়নেও প্রভাব ফেলে। এই সময়ে রাডার, জেট ইঞ্জিন, পারমাণবিক অস্ত্র এবং কম্পিউটার প্রযুক্তির সূচনা হয়।
যুদ্ধোত্তর বিশ্বে “শীতল যুদ্ধ” নামে এক ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা মূলত অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত আধিপত্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। উভয় পরাশক্তি তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট ক্রমাগত বাড়াতে থাকে। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা (Nuclear Arms Race) ছিল শীতল যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু।
১৯৫০ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় বিশ্বে সর্বোচ্চ থাকে; একসময় তা তার মোট জিডিপির ৬-৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নও তার সীমিত অর্থনীতির বড় অংশ সামরিক খাতে ব্যয় করে, যা পরবর্তীতে তার আর্থিক পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই দীর্ঘ শতবর্ষীয় সময়কালে সামরিক ব্যয় কেবল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা ও কূটনৈতিক প্রভাবের পরিমাপক হিসেবেও কাজ করেছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, জোট রাজনীতি, এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতিটি ধাপে সামরিক ব্যয়ের ভূমিকা ছিল নির্ধারক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শীতল যুদ্ধ পর্যন্ত মানবসভ্যতার এই সামরিক প্রতিযোগিতা আমাদের শেখায়—যুদ্ধ যতই অগ্রগতি বয়ে আনুক, অতিরিক্ত সামরিক ব্যয় প্রায়শই মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির এক গভীর ছায়া রেখে যায়।