ঢাকাশনিবার , ২৭ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

নারীর সংখ্যা কোথায় বেশি, কোথায় কম-বৈশ্বিক জনসংখ্যার এক পর্যালোচনা

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৯ অগাস্ট ২০২৫, ৩:৪২ বিকাল

Link Copied!

শীতল এক বিকেলের কথা। ইউরোপের একটি ট্রেনে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন এক সমাজবিজ্ঞানী। তিনি দেখছিলেন, প্রতিটি স্টেশনে যাত্রী নামছে–ওঠছে, কিন্তু তার চোখে ধরা পড়ছিল এক বিশেষ বিষয়। অধিকাংশ আসনেই নারী যাত্রীর সংখ্যা যেন পুরুষদের তুলনায় বেশি। পরের সপ্তাহেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যান এক গবেষণা সম্মেলনে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে হোটেল লবিতে, সেখানকার দৃশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সর্বত্র পুরুষের প্রাধান্য। এ অভিজ্ঞতা থেকেই তার মনে জন্ম নিল একটি প্রশ্ন—পৃথিবীর কোথায় নারীর সংখ্যা বেশি আর কোথায় কম, আর কেনই বা এমন বৈষম্য রয়েছে?

জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য এই প্রশ্নের উত্তর দেয়। বিশ্বে মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী, তবে দেশভেদে এই অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। কোথাও নারীর সংখ্যা পুরুষকে ছাড়িয়ে গেছে, আবার কোথাও পুরুষের আধিক্য এতটাই প্রবল যে, নারীরা মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশও নয়। এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা বাস্তবতা, যা প্রতিটি দেশের জনসংখ্যার গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।

চীনের মতো বৃহৎ জনবহুল দেশে বর্তমানে নারীর অংশ 48.7 শতাংশের কাছাকাছি। দেশটির দীর্ঘদিনের এক সন্তান নীতি, পুত্রসন্তানের প্রতি সামাজিক প্রবণতা এবং লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় কম। তবে বৈশ্বিক পরিসরে চীনের অবস্থা খুব ব্যতিক্রম নয়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর দিকেও তাকালে দেখা যায় একই চিত্র। ভারতে নারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার মাত্র 48 শতাংশ, পাকিস্তানে 48.5 শতাংশ এবং বাংলাদেশে 49.4 শতাংশ। এই অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো, পুত্রসন্তানের প্রতি আকর্ষণ, বাল্যবিবাহ এবং নারীর স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা প্রজনন হারের ভিন্নতা সৃষ্টি করেছে। ফলে এখানে পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় সামান্য বেশি থেকে অনেক বেশি পর্যন্ত হতে পারে।

অন্যদিকে ইউরোপে গেলে চিত্র ভিন্ন। পর্তুগালে নারীর সংখ্যা 53 শতাংশেরও বেশি। ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, হাঙ্গেরি বা পোল্যান্ডেও একই প্রবণতা। এর প্রধান কারণ হচ্ছে নারীর গড় আয়ু পুরুষের তুলনায় দীর্ঘ হওয়া। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, নারীদের তুলনামূলকভাবে নিরাপদ জীবনযাপন এবং শারীরবৃত্তীয় কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে ইউরোপের প্রতিটি দেশেই দেখা যায় বৃদ্ধ বয়সে নারীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে গেলে নারীরা অনেকটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ইউক্রেন ও রাশিয়ার উদাহরণও উল্লেখযোগ্য, যেখানে নারীর হার যথাক্রমে 53.7 শতাংশ। সোভিয়েত যুগ থেকে পুরুষদের উচ্চ মৃত্যুহার, যুদ্ধ ও দুর্ঘটনার প্রবণতা এবং অ্যালকোহল-সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যা এ বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এশিয়ার মধ্যভাগে, যেমন নেপালে, পরিস্থিতি ব্যতিক্রম। নেপালে নারীর অংশ 54.2 শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বোচ্চের মধ্যে একটি। এর পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, দেশটিতে বিপুলসংখ্যক পুরুষ বিদেশে কাজ করতে যায়, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা হিসাব করলে নারী অনুপাত বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, নারীর গড় আয়ু পুরুষদের তুলনায় বেশি হওয়ায় পরিসংখ্যানের ভার নারীদের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে এর সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা যায়। কাতারে নারীর হার মাত্র 24.8 শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে 30.9 শতাংশ, আর সৌদি আরবে 42.2 শতাংশ। এই অসমতা প্রাকৃতিকভাবে হয়নি। অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক, যাদের বেশিরভাগই পুরুষ, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে এখানে গিয়ে কাজ করেন। নির্মাণ শিল্প, তেল ও গ্যাস খাত, অবকাঠামো উন্নয়ন—এসব সেক্টরে মূলত পুরুষ শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে দেশগুলোর জনসংখ্যার ভারসাম্য ভয়াবহভাবে পুরুষপ্রধান হয়ে ওঠে। স্থানীয় নারী জনসংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় এই বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

আফ্রিকায় কিছুটা ভিন্ন ধারা লক্ষ্য করা যায়। নাইজেরিয়া বা ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলোতে নারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হলেও পুরুষ-নারীর মধ্যে তফাৎ খুব বেশি নয়। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশে নারীর সংখ্যা সামান্য বেশি। আফ্রিকায় উচ্চ জন্মহার, অপুষ্টি, দারিদ্র্য ও রোগব্যাধির কারণে পুরুষদের মৃত্যুহার অনেক সময় বেশি হয়, ফলে নারীর সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু আবার অনেক দেশেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র সংঘাত এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাব নারী মৃত্যুহারকেও বাড়িয়ে দেয়।

আমেরিকান মহাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রে নারীর হার 50.5 শতাংশ, যা প্রায় সমানুপাতিক বলা যায়। কানাডা, মেক্সিকো বা আর্জেন্টিনাতেও একই অবস্থা। তবে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে, বিশেষ করে কিউবা বা ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় কিছুটা বেশি। এর অন্যতম কারণ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং পুরুষদের অভিবাসন।

বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরো বিশ্বে গড়ে নারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় 49.7 শতাংশ। তবে দেশভেদে এই হার ২৫ শতাংশ থেকে ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করে। অর্থাৎ কোথাও নারীরা সংখ্যালঘু, কোথাও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ বৈষম্য কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম নয়; বরং এটি সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক প্রয়োজন, অভিবাসন প্রবণতা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিফলন।

এই পরিসংখ্যান সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য যেমন গবেষণার ক্ষেত্র, তেমনি নীতিনির্ধারকদের জন্যও বড় প্রশ্ন রেখে যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়া মানে সেখানে এখনো লিঙ্গ বৈষম্য প্রকট। অন্যদিকে ইউরোপে নারীর সংখ্যা বেশি হওয়া মানে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বৃদ্ধি, যা ভবিষ্যতে শ্রমশক্তির ঘাটতি তৈরি করতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে নারীর অভাব সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং পরিবার কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

গল্পের শুরুতে যে সমাজবিজ্ঞানীর অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছিল, তার প্রশ্নের উত্তর আজ স্পষ্ট। পৃথিবীর কোথাও নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, কোথাও আবার সংখ্যালঘু। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য এবং সংস্কৃতির জটিল যোগসূত্র। এই বৈচিত্র্যময় চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জনসংখ্যার সংখ্যাগত অনুপাত কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি জাতির সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

ঢাকায় সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংলাপ শুরু, ফিনিক্স সামিট ২০২৬ উদ্বোধন

Are you the next legend of OPPO Campus? Join OPPO Campus Ambassador to MAKE it

অপোর ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর প্রোগ্রাম শুরু, আবেদন চলছে

ইবোলা ঝুঁকিতে তিন দেশের ভ্রমণ স্থগিত

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৯২০

হেলথ প্রমোশনে যৌথ উদ্যোগে কুয়েট-ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করতে প্রাণিসম্পদ খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: প্রতিমন্ত্রী

দুপুরের মধ্যে ৬ জেলায় ঝড়সহ বজ্রবৃষ্টির আভাস

মেট্রোরেলের নতুন সময়সূচি, জেনে নিন কোন দিন কখন চলবে ট্রেন

PROGGA, ATMA Call for Tobacco Tax Structure Reform in Final Budget

চূড়ান্ত বাজেটে তামাক করকাঠামো সংস্কারের আহ্বান

টেকসই প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পাচ্ছে সংকটাপন্ন এলাকা