
বিশ্বের ১৮৬টি দেশের খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যতালিকাগত চাহিদা বিশ্লেষণ করে করা এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ নিজ দেশের জনগণের জন্য নিজস্বভাবে উৎপাদিত খাদ্যের মাধ্যমে পরিপূর্ণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। এমনকি, শীর্ষ ৫০টি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশের তালিকাতেও জায়গা পায়নি দেশটি।
২০২৫ সালের মে মাসে নেচার ফুড সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জাতীয় খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যভিত্তিক খাদ্যতালিকাগত নির্দেশিকার মধ্যে ব্যবধান’ বিষয়ক এই গবেষণায় দেখা যায়, গায়ানা বিশ্বের একমাত্র দেশ, যারা সাতটি প্রধান খাদ্য গোষ্ঠীতে ১০০ শতাংশ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।
এই সাতটি গোষ্ঠী হলো:
১. ফল
২. শাকসবজি
৩. ডাল, বাদাম ও বীজ
৪. স্টার্চযুক্ত প্রধান খাদ্য
৫. মাংস
৬. মাছ
৭. দুগ্ধজাত পণ্য
গায়ানার উর্বর পলিমাটি ও নদীনির্ভর প্রাকৃতিক সম্পদের মাধ্যমে তারা নিজ দেশের ৯ লাখ মানুষের প্রয়োজনীয় সব খাদ্য নিজস্ব উৎপাদনে মেটাতে সক্ষম।
তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ভিয়েতনাম ও চীন, যারা ছয়টি খাদ্য গোষ্ঠীতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এছাড়া, ২৩টি দেশ পাঁচটি গোষ্ঠীতে খাদ্যে স্বনির্ভর হতে পেরেছে।
ইউরোপে ফল-সবজির ঘাটতি, এশিয়ায় দুধের অভাব
গবেষণায় দেখা যায়, ইউরোপীয় দেশগুলো ফল ও সবজিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হিমশিম খাচ্ছে। যেমন—রাশিয়া অভ্যন্তরীণ ফলের চাহিদার মাত্র ৩৩%, লাটভিয়া ১৩% এবং এস্তোনিয়া মাত্র ৩% পূরণ করতে পারে। তবে দক্ষিণ ইউরোপের দেশ স্পেন নিজ দেশের চাহিদার চেয়ে চারগুণ বেশি ফল ও সবজি উৎপাদন করে, যা উত্তর ইউরোপে রপ্তানি করা হয়।
অন্যদিকে, এশিয়ার দেশগুলো দুগ্ধজাত পণ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে। ভিয়েতনাম ও চীনের মতো দেশেও দুগ্ধ পণ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা মাত্র ১৪% ও ২৯%। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু, ছোট চারণভূমি এবং স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস, যা বৃহৎ পরিসরে পশুপালন সীমিত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান মাঝামাঝি
যুক্তরাষ্ট্র সাতটির মধ্যে চারটি খাদ্য গোষ্ঠীতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও ফল ও সবজিতে পিছিয়ে। উদাহরণস্বরূপ:
১. ফল: ৭০%
২. সবজি: ৬১%
৩. মাছ: ৪৩%
৪. দুগ্ধ: ৪০৯%
৫. ডাল: ১২৫৯%
৬. স্টার্চি স্ট্যাপল: ১৮৮%
৭. মাংস: ৭১৭%
তবে গবেষণায় এটিও বলা হয়, অনেক দেশই চাইলেই নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদন করতে সক্ষম, কিন্তু আমদানি অনেক সময় আরও সাশ্রয়ী ও সহজ হয় বলেই তারা তা করে।
বাংলাদেশ কোথায়?
গবেষণায় বাংলাদেশের নাম শীর্ষ ৫০ দেশের মধ্যে নেই, অর্থাৎ দেশের জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় সাতটি খাদ্য গোষ্ঠীর কোনও একটিতেও ১০০% স্বনির্ভরতা অর্জিত হয়নি। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায়, নানা মৌসুমি ও জলবায়ুজনিত বাধা, কৃষিজমির ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামোর দুর্বলতা এর জন্য দায়ী।
এই গবেষণা বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কেবল উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়, বরং সুপরিকল্পিত খাদ্যনীতি, কৃষির আধুনিকীকরণ ও সুষম খাদ্যপুষ্টির উপর জোর দিতে হবে।