ঢাকাবুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

উৎপাদনের রাজনীতিঃ ২০২৩ সালের শীর্ষ শিল্প শক্তির দেশগুলোর বিশ্লেষণ

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৫ জুলাই ২০২৫, ১১:০৬ সকাল

Link Copied!

প্রাচীন কালে সভ্যতার ভিত্তি গড়ে উঠেছিল কৃষিকে কেন্দ্র করে। এরপর শিল্পবিপ্লব পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিল। যেসব জাতি উৎপাদন করতে শিখল, তারা শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, সাংস্কৃতিক ও সামরিকভাবেও আধিপত্য বিস্তার করল। ২০২৩ সালের পৃথিবীতে শিল্প উৎপাদন আবারও বিশ্বশক্তি নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। এক দেশ আরেক দেশকে টেক্কা দেওয়ার জন্য শুধুমাত্র পারমাণবিক অস্ত্র বা সামরিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে না, বরং তাদের লক্ষ্য এখন—কে কত বেশি উৎপাদন করতে পারে, কে কত দ্রুত জিনিস বানাতে পারে, কে কত উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করতে পারে।

এই বাস্তবতার মাঝেই উঠে আসে জাতিসংঘ পরিসংখ্যান বিভাগ ও স্ট্যাটিস্টা প্রকাশিত একটি তথ্য, যেখানে ২০২৩ সালের বিশ্বের শীর্ষ শিল্প উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকা উঠে এসেছে। এতে প্রথম স্থান ধরে রেখেছে চীন, যার উৎপাদন মূল্য ৪.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই এক দেশই বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় এক চতুর্থাংশের বেশি পরিচালনা করছে।

চীনের এই আধিপত্য এসেছে বহুদিনের পরিকল্পিত শিল্পনীতি, শ্রমঘন উৎপাদন, কম খরচে পণ্য নির্মাণ এবং প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে। বিশ্বব্যাপী চীনা পণ্যের চাহিদা এবং তাদের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিই এই নেতৃত্বের ভিত্তি। পণ্যের পরিসীমা বিশাল—ইলেকট্রনিক্স, বস্ত্র, যানবাহন, মেডিকেল সামগ্রী, ভারী যন্ত্রপাতি, এমনকি মহাকাশ প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ পর্যন্ত।

তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যার উৎপাদন মূল্য ২.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। যদিও এটি চীনের তুলনায় অনেকটাই কম, তবে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন পদ্ধতি অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর, স্বয়ংক্রিয়, এবং উচ্চমূল্যের পণ্যকেন্দ্রিক। বিমান শিল্প, অস্ত্র তৈরি, ফার্মাসিউটিক্যালস, এবং সফটওয়্যার হার্ডওয়্যার যন্ত্রাংশে দেশটি অত্যন্ত শক্তিশালী।

তৃতীয় এবং চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে জাপান ও জার্মানি (প্রত্যেকের উৎপাদন ৮০০ বিলিয়ন ডলার)। এই দুটি দেশ পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে পরিশীলিত, নির্ভুল এবং মানসম্মত পণ্য প্রস্তুতকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। জাপান মূলত ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি, রোবটিক্স ও অটোমেশন যন্ত্র তৈরিতে অগ্রণী। জার্মানি বিশ্বের অন্যতম রপ্তানিনির্ভর দেশ, যাদের পণ্য মান ও নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে শীর্ষে। বিশেষ করে তাদের BMW, Mercedes-Benz, Siemens-এর মতো ব্র্যান্ড বিশ্ববাজারে বিস্তৃত।

দক্ষিণ কোরিয়া (৫০০ বিলিয়ন ডলার) ও ভারত (৫০০ বিলিয়ন ডলার) সমানভাবে তালিকায় পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্থানে অবস্থান করছে। দক্ষিণ কোরিয়া তার ইলেকট্রনিক্স, চিপ নির্মাণ এবং অটোমোবাইল শিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ, বিশেষত Samsung, LG, Hyundai এর মতো বিশ্বব্যাপী কোম্পানির জন্য। ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে “Make in India” উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে। ভারী শিল্প, ফার্মাসিউটিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স এবং ডিফেন্স উৎপাদনে তারা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করছে।

মেক্সিকো এবং ইতালি তালিকার পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে (প্রত্যেকে ৪০০ বিলিয়ন ডলার)। মেক্সিকো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাব হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে মোটরগাড়ি ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যে। ইতালি বিশ্বখ্যাত এর ফ্যাশন ও বিলাসবহুল সামগ্রীর জন্য, পাশাপাশি হাই-এন্ড মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতিতে।

ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রাজিল প্রত্যেকেরই শিল্প উৎপাদন মূল্য ৩০০ বিলিয়ন ডলার করে। এদের মধ্যে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ঐতিহাসিকভাবে শিল্পজাত সামগ্রীতে সমৃদ্ধ। রাশিয়া মূলত খনিজ ও ভারী যন্ত্রপাতি, সামরিক প্রযুক্তি, এবং জ্বালানিভিত্তিক শিল্পে প্রভাব বিস্তার করে। ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিল এই তালিকায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধি, যারা ধীরে ধীরে বিশ্ব উৎপাদন ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।

পরবর্তী ধাপে রয়েছে স্পেন, কানাডা, আয়ারল্যান্ড, তুরস্ক, সৌদি আরব, সুইজারল্যান্ড (প্রত্যেকে ২০০ বিলিয়ন ডলার)। এই দেশগুলো উচ্চমানের পণ্য, খনিজসম্পদ, এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে।

সর্বশেষ তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, থাইল্যান্ড (প্রত্যেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার)। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ হিসেবে পোল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের উৎপাদনশীলতা EU বাজারে প্রবেশাধিকারের কারণে লাভবান হচ্ছে। থাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম উৎপাদন-ভিত্তিক অর্থনীতি, যেখানে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, গাড়ি ও ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন উল্লেখযোগ্য।

উল্লেখযোগ্যভাবে, “অন্যান্য” ক্যাটাগরিতে বাকি বিশ্বের সম্মিলিত উৎপাদন মূল্য ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে, যা বোঝায় যে শতাধিক দেশ মিলেও চীনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছে না। এটি বৈশ্বিক উৎপাদন ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

এই তালিকা একটি দিক নির্দেশ করে—বিশ্ব রাজনীতিতে নেতৃত্বের চাবিকাঠি এখন প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও উৎপাদনের সক্ষমতা। কূটনীতি, সামরিক জোট কিংবা ভাষাগত প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কারখানার ঘূর্ণায়মান চাকা ও অটোমেটেড রোবটিক লাইন। যার উৎপাদনশীলতা বেশি, তারই কণ্ঠস্বর শোনা যায় বেশি।

বাংলাদেশ এখনো এই তালিকায় প্রবেশ করতে পারেনি। তৈরি পোশাক শিল্প, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, রপ্তানির বৈচিত্র্য, এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারলে আগামী দুই দশকে বাংলাদেশও এই তালিকায় উঠে আসতে পারে।

একবিংশ শতাব্দীর শিল্পযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। উৎপাদনই এখন আসল রাজনীতি।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

Xiaomi Unveils REDMI 17 5G Featuring a Snapdragon 5G Processor

স্ন্যাপড্রাগন ফাইভজি প্রসেসরসহ রেডমি ১৭ ফাইভজি উন্মোচন করল শাওমি

আগামী গ্রীষ্মের আগে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে: প্রধানমন্ত্রী

পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়তে সব প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দুই বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা

নেপালে অবতরণের সময় দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ, নিহত ১

বুয়েটের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হলেই মিলবে ই-রিকশার নিবন্ধন

সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হলে ডিলারশিপ বাতিল: কৃষিমন্ত্রী

গ্যাস সংকটের মধ্যে নোয়াখালীতে নতুন গ্যাসের সন্ধান

এক দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি

হিমালয়ে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা, ঝুঁকির মুখে প্রায় ৩ লাখ মানুষ

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জরুরি প্রস্তুতি, কীসের আশঙ্কায় খাবার-পানি মজুতের পরামর্শ?