
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য—বিশেষত রুটি ও বিস্কুটের ওপর ভ্যাট বহাল রাখায় দেশের দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এ বিষয়ে সরকারের করনীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা ও ভ্যাট’ শীর্ষক এই সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে ইআরএফ ও ইয়ুথ পলিসি নেটওয়ার্ক (ওয়াইপিএন)। ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়াইপিএন-এর হেড অব রিসার্চ কে এম ইমরুল হাসান। আলোচনায় অংশ নেন প্রথম আলোর সহকারী বার্তা সম্পাদক পার্থ সংকর সাহা, ওয়াইপিএন-এর ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর মো. আকবর হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাপসী রাবেয়া এবং বাংলাদেশ ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শফিকুর রহমান ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।
প্রবন্ধে উপস্থাপন করা হয় যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রুটি ও বিস্কুটের ওপর পূর্বের ৫ শতাংশ ভ্যাট বৃদ্ধি করে ৭.৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের মানুষদের ৬০ শতাংশ সকালের খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন এবং বিস্কুট-রুটি তাদের জন্য ভাতের সস্তা বিকল্প হয়ে উঠেছে। ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে পণ্যের দাম বাড়ছে অথবা আকার ছোট হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রান্তিকদের পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তায়।
ওয়াইপিএন-এর মাঠ গবেষণা তুলে ধরে আকবর হোসেন বলেন, রুটি-বিস্কুট এখন নাস্তা নয়, বরং দরিদ্র মানুষের একবেলার খাবার। গবেষণায় ৭০% খুচরা বিক্রেতা জানিয়েছেন, ভ্যাট বৃদ্ধির কারণে পণ্যের বিক্রি কমেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এই পণ্যে ভ্যাট হার অনেক বেশি—যেখানে ভারতে এটি শূন্য, আর নেপালে ১%-২%।
তাপসী রাবেয়া বলেন, খাদ্য শুধু অধিকার নয়, এটি জীবনধারণের মৌলিক অধিকার। উচ্চ ভ্যাট আরোপ এই অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। তিনি সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যায্য করনীতির আহ্বান জানান।
শফিকুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, যদি শূন্য ভ্যাট দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে সর্বোচ্চ ৩% রাখা হোক—যা এফবিসিসিআইও সুপারিশ করেছে।
পার্থ সংকর সাহা বলেন, এই করনীতি দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবনমানকে হুমকির মুখে ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে অতি দরিদ্র হতে পারে।
আবদুর রহমান খান বলেন, ভ্যাট ব্যবস্থায় দুর্বলতা আছে, কিন্তু দেশের রাজস্ব চাহিদা, ঋণ নির্ভরতা ও এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া বিবেচনায় করনীতি নির্ধারণ করতে হয়। তিনি স্বীকার করেন, ৭.৫% ভ্যাটও আদর্শ নয়, এবং ভবিষ্যতে বিষয়টি মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
বক্তারা বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতে একটি জনবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করনীতি প্রণয়ন সময়ের দাবি। তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যে ভ্যাট হ্রাস বা বাতিল করে প্রান্তিক জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের আহ্বান জানান।