
রোজকার রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে যে খাবারটি, তা প্রায় সবার পছন্দ—মুরগির মাংস। সহজলভ্য দাম, ঝটপট রান্না আর পুষ্টিগুণের কারণে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে প্রোটিনের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে এটি। শহর থেকে গ্রাম, বাজার থেকে অনলাইন, সর্বত্রই ব্রয়লার মুরগির জয়জয়কার। কিন্তু এই পরিচিত খাবারটির পেছনেই লুকিয়ে আছে এক নতুন আতঙ্ক—ইশেরিশিয়া আলবার্টি (Escherichia albertii) নামের এক মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া, যা এখন বিজ্ঞানীদের দুশ্চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে।
২০২৫ সালের শুরুতে জাপানে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা গোটা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। স্থানীয়ভাবে বিক্রি হওয়া ব্রয়লার মুরগির মাংসে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ধরা পড়ে, এবং সেই মাংস খেয়ে শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হন। আক্রান্তরা ভুগতে থাকেন ফুড পয়জনিং, ডায়রিয়া, পেটে তীব্র ব্যথা, এমনকি কিডনির জটিলতার মতো মারাত্মক উপসর্গে। এরপরই জাপান সরকার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত শুরু করে। গবেষণাগারে নিশ্চিত হয়—এই সংক্রমণের মূল কারণ Escherichia albertii, যা ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার একটি রূপান্তরিত প্রজাতি।
এই ঘটনার পর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জায়েদুল হাসান জাপানি গবেষকদের সহায়তায় বাংলাদেশেও একই ধরনের গবেষণা চালান। দেশের চারটি জেলা থেকে ১৭টি ব্রয়লার মুরগির নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়। চমকে ওঠার মতো ফলাফল—সবকটি নমুনাতেই ধরা পড়ে ই. আলবার্টি ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি।
এই ব্যাকটেরিয়াটি শুধু খাবার থেকেই নয়, ছড়িয়ে পড়ছে পরিবেশেও। মাংস কাটার ছুরি, ব্লিডিং কন, মুরগি সংরক্ষণের ট্রে এবং দোকান কর্মীদের হাত ধোয়ার পানি পর্যন্ত পাওয়া গেছে এই ব্যাকটেরিয়ায় দূষিত। এমনকি রান্নার আগে হাত না ধুলেও আপনি সহজেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
Escherichia albertii নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ এটি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী (antibiotic-resistant)। গবেষণায় দেখা গেছে, এই জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে প্রায় ৯৪% ক্ষেত্রে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। এর ফলে সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং শরীর মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, এই জীবাণু মানুষের শরীরে এমন জিনগত পরিবর্তন আনতে পারে যার প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়—এটি বাস্তব। দেশের বাজারে যেসব ব্রয়লার মুরগি প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের পাতে পৌঁছায়, সেগুলোর অনেকগুলোর দেহেই রয়েছে ই. আলবার্টির মত প্রাণঘাতী জীবাণুর অস্তিত্ব। আরও ভয়াবহ হলো, এ জীবাণু শুধু পেটের অসুখ সৃষ্টি করে না, বরং মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দেয়। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে এমনভাবে, যা একসময় রোগ চিকিৎসাকে প্রায় অসম্ভব করে তুলতে পারে।
শুধু বাংলাদেশ নয়—জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক। জাপানে এই ঘটনার পরই বাজার পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় শুরু হয়েছে ব্রয়লার মুরগির উৎপাদনে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফুড ট্রেসেবিলিটি আইন জারি করা হয়েছে যাতে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে পরিষ্কার যোগসূত্র থাকে, এবং দূষিত খাদ্য সহজেই চিহ্নিত করা যায়।
তবে বাংলাদেশে এখনো এ বিষয়ে বড় কোনো সরকারি তৎপরতা দেখা যায়নি। যদিও ব্যক্তি পর্যায়ে গবেষণা হচ্ছে, সরকারি স্তরে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়ে গেছে। বাজারে বিক্রি হওয়া মুরগিগুলো কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে লালন-পালন হয়েছে, কোন অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে—এ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কোনো ধারণা নেই। ফলে মানুষ অজান্তেই আক্রান্ত হচ্ছে ভয়াবহ ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে।
এই অবস্থায় প্রতিকার হিসেবে কয়েকটি মূল উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, পোলট্রি শিল্পে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপে জীবাণুনাশক ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মান নিশ্চিত করা আবশ্যক। তৃতীয়ত, বাজার ও সুপারশপগুলোতে খাদ্য বিশুদ্ধতা পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা উচিত যাতে ভোক্তা জানেন, তিনি কী খাচ্ছেন। সেই সঙ্গে সচেতনতা তৈরি করাও জরুরি—রান্নার আগে ভালোভাবে ধোয়া, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় মাংস সেদ্ধ করা, এবং রান্নাঘরের উপকরণগুলোর আলাদা ব্যবহার এই জীবাণুর ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, এখনই সময় দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সরকার, পোলট্রি খাত এবং ভোক্তাদের একসাথে কাজ করার। কারণ এই সংকট শুধুমাত্র একটি খাদ্যসামগ্রীকে ঘিরে নয়—এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকির সংকেত। আজ যদি আমরা সতর্ক না হই, কাল হয়তো পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে।
ইশেরিশিয়া আলবার্টি আমাদের চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে বিজ্ঞানী হতে হয় না। প্রতিদিনের খাবার যেন অসুস্থতার উৎস না হয়, সেজন্য এখনই সময়—সচেতনতা, নীতিনির্ধারণ, এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের। আমাদের সন্তানের পাতে যেন নিরাপদ খাবার থাকে, সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।