ঢাকামঙ্গলবার , ৩ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য

ভ্যাপিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা: গবেষকরা কেন উদ্বিগ্ন

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৫০ সকাল

Link Copied!

ভ্যাপিংকে বহুদিন ধরেই ধূমপানের তুলনায় কম ক্ষতিকর বিকল্প হিসেবে দেখা হতো- কারণ এতে সিগারেটের মতো দহন নেই, ফলে টার, কার্বন মনোক্সাইড ও দহনজাত হাজারো বিষাক্ত উপাদান তৈরি হয় না। কিন্তু কম ক্ষতিকর বললেই যে এটি নিরাপদ, সেই নিশ্চয়তা নেই। বরং যুক্তরাজ্যে নিকোটিন ব্যবহার অভ্যাসে সাম্প্রতিক বড় পরিবর্তন আবারও দেখিয়ে দিয়েছে- ভ্যাপ ও সিগারেট, দুটোই ক্ষতিকর এবং দুটিরই দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাস্তব।

অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকসের (ওএনএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গ্রেট ব্রিটেনে ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ই-সিগারেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রথমবারের মতো ধূমপায়ীদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ নিয়মিত বা মাঝে মাঝে ভ্যাপ ব্যবহার করেন, যেখানে ধূমপানের সঙ্গে যুক্ত প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা প্রায় ৪৯ লাখ। এই প্রবণতা একদিকে ধূমপানজনিত ক্যান্সার, হৃদরোগ ও শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে বলে আশা জাগালেও- অন্যদিকে ভ্যাপ ছাড়তে মানুষের বাড়তে থাকা সংগ্রাম, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে নিকোটিন আসক্তি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, জনস্বাস্থ্যকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞদের গবেষণা এক জায়গায় গিয়ে মিলছে: সিগারেটের ক্ষতি ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী, কিন্তু ভ্যাপিংও ক্ষতিহীন নয়। ভ্যাপের অ্যারোসলের রাসায়নিক কণা ফুসফুসে প্রদাহ, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা এবং নিকোটিন-আসক্তি বাড়াতে পারে- যার পূর্ণ প্রভাব কয়েক দশক পর আরও স্পষ্ট হতে পারে। উপরন্তু ভ্যাপিংয়ের সহজলভ্যতা, গন্ধ কম হওয়া এবং যেকোনো সময় কয়েক সেকেন্ডে ব্যবহার করার সুবিধা অনেককে এমন এক ‘অটোপাইলট’ অভ্যাসে আটকে দিচ্ছে, যেখানে নিকোটিন গ্রহণের পরিমাণ বুঝতেই পারছেন না ব্যবহারকারীরা। ফলে দেখা যাচ্ছে, ধূমপান কমলেও নিকোটিন নির্ভরতা- ভিন্ন রূপে- আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের সামনে এখন দ্বিমুখী বাস্তবতা: ধূমপান ছাড়াতে ভ্যাপিং ক্ষতি-হ্রাস হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে এটি এক নতুন প্রজন্মের জন্য নিকোটিন আসক্তির প্রবেশদ্বারও হয়ে উঠতে পারে। তাই জনস্বাস্থ্য নীতি ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত—দুটো ক্ষেত্রেই বার্তা পরিষ্কার: কম ক্ষতিকর মানে নিরাপদ নয়; ভ্যাপ এবং সিগারেট—দুটোই ক্ষতিকর, এবং দুটো থেকে মুক্ত হওয়াই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর পথ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাপিংয়ে আসক্তি শুধু নিকোটিনের কারণে নয়- আচরণগত অভ্যাসও বড় ভূমিকা রাখে। নিকোটিন মস্তিষ্কে এমন পরিবর্তন ঘটায় যাতে কমে গেলে তীব্র তাগিদ তৈরি হয় এবং অস্থিরতা, বিরক্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া বা ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। একই সঙ্গে ভ্যাপিং অনেকের দৈনন্দিন রুটিনের সঙ্গে জুড়ে যায়- স্ট্রেসে, কাজের বিরতিতে, সামাজিক পরিবেশে, উদ্বেগে কিংবা শুধু ফোন স্ক্রল করার সময়ও। এই দুই স্তরের নির্ভরতা একে অন্যকে শক্তিশালী করে। ফলে কার্যকর সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা এমন পদ্ধতির দিকে জোর দিচ্ছেন, যা একদিকে নিকোটিন-উইথড্রয়াল সামলাবে এবং অন্যদিকে অভ্যাসগত ট্রিগার ভাঙবে।

ভ্যাপিং ছাড়ার বিষয়ে গবেষণা এখনও তুলনামূলক নতুন হলেও কিছু কৌশল ইতোমধ্যে আশাব্যঞ্জক বলে দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় গবেষকেরা ইঙ্গিত পেয়েছেন, টেক্সট-মেসেজ ভিত্তিক সহায়তা বিশেষ করে কিশোর ও তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ছাড়ার হার বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ধূমপান ছাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত ওষুধ ভ্যারেনিক্লিন প্রাপ্তবয়স্ক ভ্যাপ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও সাফল্য বাড়াতে পারে- যদিও প্রমাণ আরও শক্ত করতে বড় গবেষণা প্রয়োজন। আরেকটি পরীক্ষিত দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এমন থেরাপি, যা তাগিদকে ‘দমন’ করার বদলে তা সহ্য করে এগিয়ে যেতে শেখায়। গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিশ্রুতি থেরাপি নামে পরিচিত এই পদ্ধতি মানুষকে শেখায় কীভাবে অস্বস্তিকর অনুভূতি বা ক্রেভিংকে উপস্থিত থাকতে দিয়ে, তাতে না ভেসে নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যেতে হয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের বার্তা একই সঙ্গে সতর্কতামূলকও। ধূমপান প্রাণঘাতী- জনস্বাস্থ্য গবেষণায় দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী নিয়মিত ধূমপায়ীদের বড় একটি অংশ ধূমপানজনিত রোগে মারা যান। তাই ভ্যাপিং ছাড়তে গিয়ে যেন কেউ সিগারেটে ফিরে না যান, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্যাপিং ছাড়ার প্রচেষ্টা তখনই করা উচিত যখন ব্যক্তি নিশ্চিত যে তিনি ধূমপানে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছেন না। অনেক ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে কমানো, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভ্যাপিং সীমিত করা, বা সাময়িকভাবে নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির সহায়তা নেওয়া বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে। কারণ নিকোটিন ছাড়ার লড়াই প্রায়ই একাধিক প্রচেষ্টা দাবি করে- এটি ব্যর্থতা নয়, বরং স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

তরুণদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর। প্রাপ্তবয়স্কদের অনেকেই ধূমপান ছেড়ে কম ক্ষতিকর বিকল্প হিসেবে ভ্যাপিং গ্রহণ করেন, কিন্তু অনেক কিশোরের ক্ষেত্রে ভ্যাপই নিকোটিনের প্রথম দরজা। তাদের মস্তিষ্ক ও ফুসফুস এখনও বিকাশমান, তাই আসক্তি দ্রুত গড়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। যুক্তরাজ্যে কিশোরদের জন্য প্রথম এনএইচএস ভ্যাপিং-ছাড়ার ক্লিনিক পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা চিকিৎসকেরা বলছেন, তরুণদের শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থামানো যায় না; কেন তারা ভ্যাপ করছে- উদ্বেগ, সামাজিক চাপ, বন্ধুমহলের প্রভাব, বা মানসিক অস্বস্তি- তা বুঝে সমাধান দিতে হয়। এই বাস্তবতা দেখায়, ভ্যাপিং সমস্যা কেবল একটি খারাপ অভ্যাস নয়; এটি মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক চাপ এবং নীতিগত নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত একটি বহুমাত্রিক ইস্যু।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা