
ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানিতে ভারত বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে বলে সম্প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূত দাশো কর্মা হামু দর্জি। তিনি বলেন, শুধু জ্বালানি নয়; জলবায়ু মোকাবিলাসহ আঞ্চলিক নানা ক্ষেত্রে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা হলে তা তিন দেশকেই লাভবান করবে। নিঃসন্দেহে এই বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান বাস্তবতায় এই সহযোগিতা আসলেই কতটা লাভজনক হবে?
বাংলাদেশ এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাগজে-কলমে স্বয়ংসম্পূর্ণ, এমনকি উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা এখন ২৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, অথচ গ্রীষ্মকালেও সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬–১৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নয়। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই অতিরিক্ত সক্ষমতা আমাদের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে যে বিপুলসংখ্যক কুইক রেন্টাল ও আইপিপি (Independent Power Producer) প্ল্যান্ট অনুমোদন দেওয়া হয়, তার অনেকগুলোই এখন অব্যবহৃত বা আংশিক চালু। অথচ সরকারকে নিয়মিত দিতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ—অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও কোম্পানিগুলো মুনাফা পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৩–২৪ অর্থবছরেই এই খাতে খরচ হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এই অর্থের চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ছে জনগণের ওপর—মূল্যবৃদ্ধি ও ভর্তুকি হ্রাসের মাধ্যমে।
দুঃখজনকভাবে, দেশীয় প্ল্যান্টগুলো অলস পড়ে থাকলেও সরকার বিদ্যুৎ আমদানির দিকে বেশি ঝুঁকছে। ভারতের ত্রিপুরা থেকে ছোট পরিসরে বিদ্যুৎ আমদানির পর এখন পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ড সীমান্ত ঘেঁষে বিশাল প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতীয় আদানী গ্রুপ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই আদানী চুক্তি একতরফা ও বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম কমলেও চুক্তির শর্ত এমনভাবে বাঁধা যে বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যেই বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে।
এর মধ্যেই এসেছে ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির প্রস্তাব। এটি নিঃসন্দেহে পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল উৎস। কিন্তু এতে ভারতের মধ্যস্থতার শর্ত আমাদের আঞ্চলিক নির্ভরতা বাড়াবে কি না, সেই প্রশ্নও জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যুৎ বাজারে ভারতের ভূরাজনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করা যায় না; ফলে প্রতিটি চুক্তিতে আমাদের স্বার্থরক্ষা ও সমতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে মূল সমস্যা হলো অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ ও জবাবদিহির অভাব। যে সময়ে উৎপাদন সক্ষমতা কম ছিল, তখন দ্রুত সমাধান হিসেবে কুইক রেন্টাল যুক্তিসঙ্গত ছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়েও তা স্থায়ী কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। এখন পরিস্থিতি এমন যে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকটে (বিশেষ করে গ্যাস ও কয়লা আমদানিতে) অনেক প্ল্যান্ট চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ আমরা উৎপাদনের চেয়ে চুক্তির দায়েই বেশি আবদ্ধ।
এখন কী প্রয়োজন
প্রথমত, বিদ্যুৎ খাতে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নিরীক্ষা (audit) করতে হবে—বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জ ও আমদানিকৃত বিদ্যুতের ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ।
দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাস্তবসম্মত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সৌর ও বায়ু শক্তির প্রকল্পগুলোর গতি বাড়ালে আমদানি নির্ভরতা কমবে।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা চুক্তিতে সমান অংশীদারিত্ব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ভারতের বা অন্য কোনো দেশের একচেটিয়া প্রভাব আমাদের অর্থনৈতিক কৌশলকে দুর্বল করবে।
সবশেষে, জ্বালানি পরিকল্পনায় রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দিতে হবে।
ভুটান-ভারত-বাংলাদেশের ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই জ্বালানি বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে-এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই সহযোগিতা হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থে, স্বচ্ছ চুক্তিতে, এবং জনগণের দায়ভার না বাড়িয়ে। নইলে অতিরিক্ত সক্ষমতা, অকার্যকর প্ল্যান্ট ও অসম বাণিজ্যিক চুক্তির এই চক্র থেকে আমরা কখনোই বের হতে পারব না।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে-একদিকে আঞ্চলিক সহযোগিতার আশা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অদক্ষতার বাস্তবতা। সময় এসেছে এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার, না হলে বিদ্যুৎ আমাদের উন্নয়নের শক্তি নয়, বরং ব্যয়ের বোঝায় পরিণত হবে।
লেখক: রঞ্জন কুমার দে, সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট
ইমেইল: rkdrev@gmail.com