
রাত জাগা অফিসকর্মী সোহেল প্রতিদিনের মতো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালেন। নিজের অজান্তেই তিনি হয়তো হারালেন জীবনের ২০ মিনিট। প্রতিটি সিগারেট যে মানুষের জীবন থেকে গড়ে প্রায় ২০ মিনিট কমিয়ে দেয়, এ তথ্য বহু গবেষণায় প্রমাণিত। অথচ ধূমপান ছেড়ে দিলে সেই হারানো সময় আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব। হয়তো ঠিক সেকেন্ডে সেকেন্ডে নয়, কিন্তু শরীর ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার শুরু করে এবং কয়েক বছরের মধ্যেই ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কমে আসে।
নীরব ঘাতকের গল্প
ধূমপানকে বলা হয় ‘সাইলেন্ট কিলার’। প্রথমদিকে মনে হয় এটি শুধু এক ধরনের আসক্তি, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানান জটিল রোগে রূপ নেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে ৮০ লাখ মানুষ ধূমপান-সম্পর্কিত রোগে মারা যায়। এর মধ্যে একটি বড় অংশই অকালমৃত্যু। বাংলাদেশেও ধূমপায়ীর সংখ্যা কয়েক কোটির বেশি, যার ফলে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ হৃদরোগ, ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক এবং ফুসফুসজনিত অসুখে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন।
কীভাবে কেটে যায় জীবন থেকে সময়
সিগারেটে থাকা নিকোটিন শরীরকে আসক্ত করে তোলে। তবে আসল ক্ষতি করে টার, কার্বন মনোক্সাইড, আর্সেনিক, সিসা ও আরও বহু রাসায়নিক পদার্থ। এগুলো রক্তনালীর ভেতরে জমে গিয়ে হার্টের রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। ফুসফুসের কোষ ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ে। প্রতিটি সিগারেট ধূমপায়ীর শরীরে নতুন করে ক্ষত তৈরি করে। গবেষকরা দেখিয়েছেন, গড়ে প্রতিটি সিগারেট মানুষের আয়ু থেকে ২০ মিনিট কমিয়ে দেয়, আর দীর্ঘদিন ধূমপান করলে জীবনের গড় আয়ু কমে যায় ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত।
ধূমপান ছাড়লেই শরীরের পরিবর্তন
সুখবর হলো, ধূমপান ছেড়ে দিলে শরীর সঙ্গে সঙ্গে পুনরুদ্ধার শুরু করে। মাত্র ২০ মিনিট পর রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ১২ ঘণ্টার মধ্যে রক্তে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা কমে আসে। দুই সপ্তাহ থেকে তিন মাসের মধ্যে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা উন্নত হয় এবং রক্তসঞ্চালন ভালো হয়। এক বছরের মাথায় হৃদরোগের ঝুঁকি অর্ধেক হয়ে যায়। আর যারা ১০-১৫ বছর ধরে ধূমপান ছাড়তে সক্ষম হন, তাদের শরীরের ঝুঁকি প্রায় ধূমপান না-করা মানুষের সমান হয়ে যায়। অর্থাৎ, হারানো সময় ধীরে ধীরে ফিরে আসে।
সামাজিক ও পারিবারিক দিক
ধূমপায়ীরা শুধু নিজেদের নয়, পরিবার ও আশপাশের মানুষকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেন। সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোক বা পরোক্ষ ধূমপান শিশু ও নারীদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়। শিশুদের হাঁপানি, নিউমোনিয়া, কানের সংক্রমণ বাড়ে, এমনকি হঠাৎ মৃত্যুও হতে পারে। তাই ধূমপান বন্ধ করা মানে শুধু নিজের জীবন বাঁচানো নয়, বরং প্রিয়জনদেরও সুরক্ষিত রাখা।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ধূমপানের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। অথচ চিকিৎসকরা বলছেন, ধূমপান বন্ধ করলে চিকিৎসার খরচ অর্ধেকের বেশি কমে যেতে পারে। ধূমপানের টাকায় যে মানুষ প্রতিদিন নিজের শরীর নষ্ট করছেন, সেই টাকাই পরিবার, শিক্ষা কিংবা সুস্থ জীবনযাপনে খরচ করা সম্ভব।
প্রতিটি সিগারেটই যেন জীবনের ক্যালেন্ডার থেকে একটি পাতার সমান সময় ছিঁড়ে নেয়। অথচ মানুষ সেই ক্ষতি টের পান না, যতক্ষণ না বড় কোনো রোগ আঘাত হানে। এখনই সময় নিজের জীবনের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার। ধূমপান ছাড়লেই ফেরত মিলবে সুস্থ শরীর, দীর্ঘ আয়ু ও প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো মূল্যবান সময়।