ঢাকাসোমবার , ৭ জুলাই ২০২৫

পাম অয়েল: বিশ্বের রান্নাঘর জয়ের এক নিঃশব্দ প্রতিযোগিতা

রঞ্জন কুমার দে
জুলাই ৭, ২০২৫ ১:৫৩ অপরাহ্ণ । ৮৬৮ জন

এক সকালে ভারতের কেরালা রাজ্যের এক গৃহবধূ, অনুপমা দেবী, বাজার থেকে ঘরে ফিরেই রান্নাঘরে ঢুকে পড়লেন। পাত্রে যখন তিনি আলু ও পেঁয়াজের মিশ্রণ চড়িয়ে দিলেন, তখন প্যাকেট থেকে গড়িয়ে পড়ল একটি ঘন হলুদ তেল—পাম অয়েল। গন্ধটা পরিচিত। ভারতবর্ষে বহু ঘরে যেমন এই দৃশ্য প্রতিদিন ঘটে, তেমনি বিশ্বের বহু দেশেই এই তেলের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে নীরবে, অথচ শক্তিশালী প্রভাব রেখে।

২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে পাম অয়েলের চাহিদা ছিল রেকর্ড পরিমাণ। সেই বছর ভারত, চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রধান দেশগুলো মিলিয়ে প্রায় ৩০ মিলিয়ন টনের বেশি পাম অয়েল আমদানি করে। এটি শুধু খাদ্য খাতে নয়, শিল্প, কসমেটিক্স, এমনকি জ্বালানি খাতে ব্যবহার হওয়ায় এর চাহিদা বহুমুখী। আজ আমরা এই প্রতিবেদনটিতে বিশ্লেষণ করব কেন এবং কীভাবে পাম অয়েল হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে আমদানি-নির্ভর উদ্ভিজ্জ তেল, এবং কোন কোন দেশ এর ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল।

ভারত: উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক
২০২২ সালে ভারত ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাম অয়েল আমদানিকারক দেশ, যার মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ৯.১৭ মিলিয়ন টন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে মূলত এই তেল আসে। ভারতের তেলের বাজার মূলত দুইভাগে বিভক্ত—পাম অয়েল এবং সয়াবিন/সরিষার তেল। কিন্তু পাম অয়েলের দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পেও এর চাহিদা প্রবল।

ভারত সরকার মাঝে মাঝে পাম অয়েলের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেয় ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে। বিশেষ করে যখন ভোজ্যতেলের আন্তর্জাতিক দাম বেড়ে যায়, তখন এই নীতিগত পরিবর্তন বাজার স্থিতিশীল রাখে। ২০২২ সালের শেষ দিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে সূর্যমুখী তেল সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে, ভারতের আমদানির ভর আরও বেশি পাম অয়েলের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

চীন: বিশাল জনগোষ্ঠীর এক নীরব ভোক্তা
চীনের মোট পাম অয়েল আমদানির পরিমাণ ছিল ৪.৯৪ মিলিয়ন টন, যা দেশটির খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, বেকারি, রেস্তোরাঁ, এমনকি কসমেটিক্স শিল্পে ব্যবহৃত হয়। যদিও চীন নিজেও রেপসিড ও সয়াবিন তেল উৎপাদনে আগ্রহী, তবুও পাম অয়েলের স্বল্পমূল্য ও দীর্ঘ সংরক্ষণক্ষমতা এটিকে সুবিধাজনক করে তোলে।

চীনে নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও নগরায়নের ফলে প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার বেড়েছে। আর সেখানেই পাম অয়েলের চাহিদা। উপরন্তু, চীনের নীতিনির্ধারকরা খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে পাম অয়েলের বিকল্প উৎস রাখে, যার মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া অন্যতম।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশ: উপমহাদেশের উদীয়মান বাজার
পাকিস্তান ২০২২ সালে ২.৮২ মিলিয়ন টন এবং বাংলাদেশ ১.৭৭ মিলিয়ন টন পাম অয়েল আমদানি করেছে। এই দুই দেশের খাদ্য ব্যবস্থায় পাম অয়েল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে হোটেল, দোকান, রেস্টুরেন্ট, কনফেকশনারি, চিপস কারখানায় এর ব্যবহার বিশাল। বাংলাদেশে পাম অয়েল মূলত রান্নায় ব্যবহার হয় এবং স্থানীয় বাজারে এটি তুলনামূলক সস্তা বিক্রি হয়।

বাংলাদেশে পরিশোধিত (RBD) পাম অয়েল আমদানিতে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া মূল উৎস হিসেবে কাজ করে। তবে ২০২২ সালে ইন্দোনেশিয়ার পাম অয়েল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। তখন সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে বাজার সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।

পাকিস্তানেও একই ধরনের সংকট দেখা দেয়। ডলারের সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেশটির তেল আমদানিতে প্রভাব ফেলে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা এত বেশি যে সরকার বাধ্য হয়ে উচ্চমূল্যেও তেল আমদানিতে বাধ্য হয়।

যুক্তরাষ্ট্র: খাদ্য ও শিল্পের বৈচিত্র্যময় চাহিদা
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২২ সালে ১.৬৯ মিলিয়ন টন পাম অয়েল আমদানি করা হয়। দেশটির খাদ্য শিল্পে যেমন এটি ব্যবহৃত হয়, তেমনি প্রসাধনী ও বায়োফুয়েল খাতেও এর ব্যবহার রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে পাম অয়েল ব্যবহারে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন মানবাধিকার ও পরিবেশ। অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় বন উজাড় করে তৈরি হওয়া তেলের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেয়।

তবে ভোক্তা চাহিদা এবং শিল্পখাতে এর কার্যকারিতা যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করেছে বিকল্প পদ্ধতিতে এই তেল আমদানি চালিয়ে যেতে। ফলে অনেক আমদানিকারক এখন RSPO (Roundtable on Sustainable Palm Oil)-সনদপ্রাপ্ত উৎস থেকে তেল আমদানিতে আগ্রহ দেখায়।

ইউরোপ: নীতিগত দ্বিধা ও বাস্তব চাহিদা
২০২২ সালে নেদারল্যান্ডস ১.৬০ মিলিয়ন টন, ইতালি ১.৩৮ মিলিয়ন টন এবং স্পেন ১.০৮ মিলিয়ন টন পাম অয়েল আমদানি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে পাম অয়েল নিয়ে একটি দ্বিধান্বিত অবস্থানে রয়েছে। একদিকে তারা বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের হুমকি এবং শ্রমজীবীদের শোষণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে; অন্যদিকে তাদের নিজস্ব শিল্প-কারখানার জন্য পাম অয়েল অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরোপে বিশেষ করে বেকারি, বিস্কুট, চকোলেট ও মার্জারিন উৎপাদনে পাম অয়েল ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া, কিছু দেশে বায়োফুয়েল উৎপাদনের অন্যতম উপাদান হিসেবেও পাম অয়েল ব্যবহৃত হয়। ফলে নীতিগত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও আমদানির হার কমেনি। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন টেকসই উৎস থেকে পাম অয়েল নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।

মালয়েশিয়া: উৎপাদনকারী হয়েও আমদানিকারক?
মালয়েশিয়া পাম অয়েলের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদক হলেও ২০২২ সালে দেশটি ১.৩৫ মিলিয়ন টন তেল আমদানি করে। কারণ দেশটির পাম অয়েল শিল্প মূলত রপ্তানিমুখী। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে এবং শিল্প-কারখানায় নির্দিষ্ট ধরনের প্রক্রিয়াজাত তেলের চাহিদা মেটাতে কিছু পরিমাণ তেল আমদানি করতে হয়। অনেক সময় রপ্তানিযোগ্য মান বজায় রাখতে স্থানীয় বাজারে বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করতে হয়।

তুরস্ক: ইউরেশীয় সেতুবন্ধনে একটি উদীয়মান বাজার
তুরস্ক ২০২২ সালে ১.০২ মিলিয়ন টন পাম অয়েল আমদানি করেছে। দেশটি ইউরোপ ও এশিয়ার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে এবং এর ভোক্তা খাদ্য বাজার অত্যন্ত সক্রিয়। তুরস্কে বিস্কুট, কেক, আইসক্রিম এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে পাম অয়েল ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে তেল রপ্তানির একটি ট্রানজিট হাব হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

বৈশ্বিক রাজনীতি ও পাম অয়েল
২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, এবং ইন্দোনেশিয়ার অভ্যন্তরীণ সংকট পাম অয়েল বাজারকে অস্থির করে তোলে। ইউক্রেন হলো সূর্যমুখী তেলের বড় সরবরাহকারী, এবং যুদ্ধের কারণে সেই রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তখন বহু দেশ পাম অয়েলের ওপর নির্ভরতা বাড়ায়।

ইন্দোনেশিয়া যখন অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়ে এবং স্থানীয় বাজারের চাপ সামাল দিতে রপ্তানি নিষিদ্ধ করে, তখন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ বহু দেশ সংকটে পড়ে। তবে মালয়েশিয়া কিছুটা সেই শূন্যতা পূরণে সহায়ক হয়।

বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে পাম অয়েল শিল্পকে আরও টেকসই পথে এগোতে হবে। অন্যদিকে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ভোজ্যতেলের চাহিদা আরও বাড়বে। সেই চাহিদা মেটাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী পাম অয়েল একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়েই থাকবে।

বিশ্বের ভোক্তারা এখন কেবল দাম দেখেই তেল বেছে নিচ্ছেন না, বরং উৎপাদনের নৈতিকতা ও পরিবেশগত প্রভাবকেও বিবেচনায় নিচ্ছেন। ফলে RSPO, পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চা, এবং ন্যায্য মজুরির মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যতের বাজারে বড় ভূমিকা রাখবে।

পাম অয়েল এখন আর শুধু একটি ভোজ্যতেল নয়; এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনীতির অংশ, যার সঙ্গে খাদ্য, শিল্প, পরিবেশ ও রাজনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ২০২২ সালের আমদানির পরিসংখ্যান শুধু পরিমাণগত তথ্য নয়, বরং তা প্রতিফলন করে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার জটিলতা, সমন্বয় এবং সংকটের ছায়া। এই তেল যেমন ঘরের রান্না ঘরে আলো জ্বালে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।