
ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পরিচ্ছন্ন ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তরুণ প্রজন্মকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ার কাজ এখন থেকেই শুরু করতে হবে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর বাংলা কলেজ পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) ও স্কাউট সদস্যদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু এ তথ্য জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আয়তনের তুলনায় অত্যন্ত জনবহুল দেশ। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস। এত মানুষের শহর পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন হলেও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তা সম্ভব।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে এই দেশ তোমরাই পরিচালনা করবে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজ এখন থেকেই শুরু করতে হবে।’
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে তরুণদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠে নামলে দ্রুত একটি জায়গা পরিষ্কার করা সম্ভব হয়। তবে এ কাজ শুধু নির্দিষ্ট কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নিজেদের উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পাশাপাশি বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদেরও সচেতন করতে হবে।
পরিচ্ছন্ন পরিবেশের সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিবার ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার থাকলে সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। অন্যদিকে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিপুলসংখ্যক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে সবার জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই মানুষকে সুস্থ রাখতে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর ডেঙ্গুতে বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন এবং অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা ডেঙ্গু প্রতিরোধের কার্যকর উপায়গুলোর অন্যতম।
তিনি জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের উদ্যোগে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। বিশেষ করে কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
রাস্তা, খাল, নদী ও জলাশয়ে ময়লা-আবর্জনা না ফেলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব বর্জ্য পরিবেশ দূষিত করে এবং রোগজীবাণু ও মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যদের মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ রাস্তায় ময়লা ফেললে তাকে বুঝিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলতে উৎসাহিত করতে হবে। প্রয়োজনে সহযোগিতাও করতে হবে। তিনি বলেন, তরুণদের এ উদ্যোগ শুধু নিজেদের জন্য নয়, সবার স্বার্থেই।
রাজধানীর বায়ুদূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান প্রায়ই ওপরের দিকে থাকে, যা অত্যন্ত বিব্রতকর। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে।
নিজের অতীত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, তাঁর বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠনের মাধ্যমে ২০০৪-০৫ সালের দিকে শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ৮০ হাজার নিমগাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন তোমাদের আমাকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। তোমরা আরও বেশি গাছ লাগাবে। ইনশাআল্লাহ, তোমরা পারবে।’
এ সময় সৌদি আরবের আরাফাতের ময়দানে নিমগাছ রোপণের ইতিহাসও তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একসময় আরাফাতের ময়দান প্রায় বৃক্ষশূন্য ছিল। পরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেখানে নিমগাছের চারা পাঠান। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের পরামর্শে সৌদি আরবের আবহাওয়ার উপযোগী বিবেচনায় নিমগাছ নির্বাচন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেখানে নিমগাছের বিস্তার ঘটে, যা এখন ‘জিয়া ট্রি’ নামে পরিচিত।
পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে জাপানের উদাহরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশটির রাস্তাঘাটে খুব কম ময়লা-আবর্জনা দেখা যায়। এর পেছনে শুধু পরিষ্কার করার ব্যবস্থা নয়, বরং মানুষের ময়লা না ফেলার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশ ও পানিদূষণ রোধে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। যেখানে-সেখানে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। ভবিষ্যৎ তোমাদের। এই দেশ তোমরাই পরিচালনা করবে।’
এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ অন্যরা।
এর আগে ডেঙ্গু ও পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি দেখতে শনিবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনে আকস্মিক পরিদর্শনে বের হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর অংশ হিসেবে তিনি মিরপুর বাংলা কলেজ পরিদর্শন করেন।