
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের আকাশজুড়ে নোনা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। চারপাশের বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বন, আর খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের উথালপাথাল ঢেউ। রূপসী সুন্দরবনের কোলঘেঁষেই শত শত বছর ধরে বসবাস করে আসছে এক প্রাচীন জনগোষ্ঠী—‘মুণ্ডা’ সম্প্রদায়।

সারা বিশ্বে যখন আদিবাসীদের অধিকার ও সংস্কৃতি নিয়ে সভা-সেমিনার হচ্ছে, তখন সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ওপর নোনা জলের গণ্ডির মধ্যে টিকে থাকার কঠিন লড়াই চালাচ্ছেন এই আদিবাসী মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ।
# সুন্দরবনে দুই শতাব্দী ধরে বসবাস করছে মুণ্ডা সম্প্রদায়
# মিষ্টি পানির তীব্র সংকটে চরম ভোগান্তি সম্প্রদায়ের মানুষ
# নদীভাঙন-প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবার বাড়-ঘর হারাচ্ছে তারা
# জঙ্গল কেটে বসতি গড়লেও তারা নিজের জমিতে পরবাসী
# জীবিকা নির্বাহের জন্য তারা প্রধানত দিনমজুরি করে থাকে
# তরুণ প্রজন্ম থেকে নিজস্ব সাদরি ভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই শতক আগে ব্রিটিশ আমলে ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে সুন্দরবনের জঙ্গল কাটার জন্য এদের নিয়ে আসা হয়েছিল। জঙ্গল কেটে জনবসতি গড়ার মূল কারিগর ছিলেন এই মুণ্ডারা। অথচ যুগ যুগ ধরে যাদের শ্রমে-ঘামে উপকূলের জনপদ গড়ে উঠলেও ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাসে তারাই আজ নিজের জমিতে পরবাসী!
শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালীনি, মুন্সিগঞ্জ, গাবুরা, পদ্মপুকুর এবং আশাশুনির কয়েকটি গ্রামে বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। উপকূলের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন তাদের জীবনের অবধারিত অংশ। আইলা, আম্পান, ইয়াস কিংবা সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়গুলোর প্রথম আঘাতটাই সইতে হয় সুন্দরবনসংলগ্ন এই মানুষগুলোকে।
উপকূলে মিষ্টি পানির তীব্র সংকট তাদের জীবনকে আরও বিষাদময় করে তুলেছে। কয়েক কিলোমিটার হেঁটে বা নৌকা বেয়ে নারীদের খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। জমিতে লবণাক্ততার কারণে আগের মতো শাকসবজি বা ধান চাষ করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বুড়িগোয়ালীনি গ্রামের বয়োবৃদ্ধ রঘুনাত মুণ্ডা (৭০) বলেন, ‘ঝড় আইলে সবাই আশ্রয়কেন্দ্রে যায়, কিন্তু আমাগো মাটির ঘর আর টিনের চাল একবার ভেঙে গেলে নতুন করে তোলার সামর্থ্য থাকে না। নদী ভাঙনে বাপ-দাদার ভিটা গেছে বহু আগে। তার ওপর চারপাশের পানি নোনা। পেটে ভাত না থাকলেও চলে, কিন্তু দিনশেষে খাওয়ার পানিটুকুর জন্য মাইলের পর মাইল হাঁটা লাগে। বাপ-দাদারা জঙ্গল কেটে মানুষ থাকার জায়গা বানাল, আর আমরা পানির কষ্টেই শেষ হয়ে গেলাম।’
সরেজমিনে দেখা যায়, একসময় যারা শিকার ও বনের সম্পদের ওপর নির্ভর করতেন, তারা এখন মূলত দিনমজুর: চিংড়ি ঘেরের বেড়িবাঁধ নির্মাণ বা মেরামতের কাজ করেন। আবার কেউ কেউ পাস নিয়ে বনে গিয়ে মধু সংগ্রহ, কাঁকড়া ও মাছ ধরেন। উপযুক্ত শিক্ষার অভাব এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে মূলধারার অর্থনীতিতে তাদের প্রবেশাধিকার এখনও অত্যন্ত সীমিত।
মুণ্ডাদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘সাদরি’ বা ‘মুণ্ডারি’ ভাষা। তবে লিখিত বর্ণমালা না থাকা এবং আধুনিক শিক্ষার প্রভাবে তরুণ প্রজন্মের মধ্য থেকে এই ভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে শত প্রতিকূলতার পরও তারা টিকিয়ে রেখেছেন তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘করম পূজা’ ও ‘সাহরাই পূজা’। মাদলের তালে তালে গোল হয়ে হাত ধরে তাদের ঐতিহ্যবাহী নাচ ও গান যেন শত কষ্টের মাঝেও এক চিলতে আনন্দের খোরাক জোগায়।
শ্যামনগর মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রী রিনা মুণ্ডা (১৯) বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব ভাষা আছে, গান আছে। কিন্তু স্কুলে বা সমাজে আমাদের নিজস্ব ভাষার কোনো বই নেই। আমরা বড়দের মুখ থেকে শুনে শুনে কিছু ভাষা শিখি, কিন্তু আমাদের পরের প্রজন্ম কি আর এটা মনে রাখতে পারবে? আমরা মূলধারায় পড়তে চাই, চাকরি করতে চাই; কিন্তু নিজেদের পরিচয় হারিয়ে নয়। সরকার যদি আমাদের ভাষার প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করত, তবে সংস্কৃতিটা বেঁচে যেত।’
এদিকে অধিকার আদায়ে সম্প্রতি কিছু বেসরকারি সংস্থা এবং সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় মুণ্ডা পরিবারগুলোকে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। অল্প কিছু মুণ্ডা ছেলে-মেয়ে এখন স্কুলে যাচ্ছে, এমনকি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের দোরগোড়াতেও পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য।
মুণ্ডা সম্প্রদায় সরকারের কাছে তাদের বেশ কিছু দাবি তুলে ধরেছে। সেগুলো হলো- নিজস্ব ভূমির আইনি মালিকানা প্রদান, মুণ্ডারি ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা, উপকূলজুড়ে মিষ্টি পানির স্থায়ী প্ল্যান্ট ও সমাধান, ঝরে পড়া রোধে বিশেষ কোটা, বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা।
আদিবাসী নিয়ে কাজ করা স্থানীয় সংগঠন ‘সুন্দরবন আদিবাসী মুণ্ডা সংস্থা’র (সামস) নির্বাহী পরিচালক কৃষ্ণ পদ মুণ্ডা বলেন, ‘সুন্দরবন উপকূলে মুণ্ডা, মাহাতো, রাজবংশীসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে, যাদের অনেকেই আজ সমাজের মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়েছে। আইলা, আম্পান বা ইয়াসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের নিজস্ব ভূমি অধিকার, বিশুদ্ধ পানীয় জলের স্থায়ী সমাধান এবং সংস্কৃতি সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের জোরালো ভূমিকা না থাকলে এই প্রাচীন ঐতিহ্য ও জনগোষ্ঠী টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’