মঙ্গল গ্রহে দ্রুত মানুষের অভিযান চালানোর স্বপ্ন অনেকদিনের। তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা মহাকাশযানের গতি বা প্রপালশন প্রযুক্তি। বর্তমানে ব্যবহৃত রাসায়নিক রকেটগুলো শক্তিশালী ধাক্কা তৈরি করতে সক্ষম হলেও দীর্ঘ মহাকাশ ভ্রমণের জন্য এগুলো খুব বেশি কার্যকর নয়। ফলে পৃথিবী থেকে মঙ্গলে পৌঁছাতে সাধারণত ৬ থেকে ৯ মাস সময় লাগে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন সম্ভাবনার কথা জানাল রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা Rosatom। সংস্থাটি সম্প্রতি একটি নতুন ধরনের প্লাজমা প্রপালশন ইঞ্জিন তৈরির কাজ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে, যা মহাকাশ গবেষণা মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি সফল হলে ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছাতে সময় কমে মাত্র ৩০ দিনে নেমে আসতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই সময়সীমা এখনো কেবল তাত্ত্বিক হিসাব। প্লাজমা ইঞ্জিনটি বর্তমানে প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক গবেষণা পর্যায়ে রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত কেবল পরীক্ষাগারে এর পরীক্ষা চালানো হয়েছে। মহাকাশে এখনো এর কোনো সফল উড্ডয়ন পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA–এর তথ্য অনুযায়ী, প্লাজমা ইঞ্জিন এক ধরনের ইলেকট্রিক প্রপালশন সিস্টেম। প্রচলিত রকেটের মতো এখানে জ্বালানি পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন করা হয় না। বরং বিদ্যুৎ ব্যবহার করে গ্যাস—সাধারণত জেনন—কে প্লাজমায় রূপান্তর করা হয়। এরপর শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে এই প্লাজমাকে অত্যন্ত উচ্চ গতিতে মহাকাশযানের পেছনের দিকে বের করে দেওয়া হয়। এর ফলে বিপরীতমুখী ধাক্কা সৃষ্টি হয়ে মহাকাশযান সামনে এগিয়ে যায়।
রাসায়নিক রকেটের তুলনায় এই প্রযুক্তি কম শক্তি উৎপন্ন করলেও এর একটি বড় সুবিধা হলো এটি দীর্ঘ সময় ধরে অবিরাম কাজ করতে পারে। এই নিরবচ্ছিন্ন ধাক্কার ফলে মহাকাশযান ধীরে ধীরে অত্যন্ত উচ্চ গতি অর্জন করতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে জ্বালানি খরচও তুলনামূলকভাবে কম হয়, যা দীর্ঘ আন্তগ্রহ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে প্লাজমা ইঞ্জিনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ শক্তি সরবরাহ করা। গভীর মহাকাশে সূর্যের আলো তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় বিশাল সৌর প্যানেল ব্যবহার করেও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা কঠিন হতে পারে। এই সমস্যার সমাধানে রুশ বিজ্ঞানীরা একটি ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎস ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন, যা ইঞ্জিনটিকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্র ৩০ দিনে মঙ্গলে পৌঁছানোর ধারণাটি রোমাঞ্চকর হলেও বাস্তবে এটি কার্যকর করতে আরও দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষার প্রয়োজন হবে। নতুন কোনো মহাকাশ প্রযুক্তি বাস্তব মিশনে ব্যবহারের আগে সাধারণত বহু বছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়, যাতে প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়।
মহাকাশ বিশ্লেষকদের মতে, যদি প্লাজমা প্রপালশন প্রযুক্তি সফলভাবে উন্নয়ন করা যায়, তবে এটি আন্তগ্রহ ভ্রমণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে মানুষের মঙ্গল অভিযানের ক্ষেত্রে যাত্রার সময় কমিয়ে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ সময় মহাকাশে অবস্থান করলে নভোচারীরা মহাজাগতিক বিকিরণের ঝুঁকিতে থাকেন।
যাত্রার সময় কমে গেলে নভোচারীদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমবে এবং মিশনের সামগ্রিক নিরাপত্তাও বাড়বে। এই কারণে ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানে উন্নত প্রপালশন প্রযুক্তির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রযুক্তিটি পুরোপুরি প্রস্তুত হলে প্রথমে মানববিহীন পণ্যবাহী মহাকাশযান বা পরীক্ষামূলক প্রোবের মাধ্যমে এটি ব্যবহার করা হতে পারে। এসব পরীক্ষামূলক মিশনে প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। এরপর ধীরে ধীরে মানববাহী অভিযানে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে প্লাজমা ও অন্যান্য ইলেকট্রিক প্রপালশন প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা গবেষণা চালাচ্ছে। ভবিষ্যতে এসব প্রযুক্তির উন্নয়ন সফল হলে মঙ্গলসহ সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহে মানুষের যাত্রা অনেক দ্রুত ও নিরাপদ হয়ে উঠতে পারে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া


