ঢাকাসোমবার , ২ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য

হাম রোধে জীবনরক্ষাকারী ‘বাবল সিপিপিএপি’ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৪ সকাল

Link Copied!

রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটেরে একটি ওয়ার্ডের বেডে শুয়ে আছে চার বছরের ছোট্ট শিশু আরাফাত। শরীরের বিভিন্ন স্থানে হামের লালচে ফুসকুড়ির পাশাপাশি তার প্রতিটি শ্বাস নিতে প্রবল কষ্ট হচ্ছে; বুকের হাড় প্রতিবার ভেতরের দিকে টেনে আসছে। অক্সিজেনের অভাবে নীল হয়ে যাওয়া মুখ আর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া সেই অবুঝ শিশুর ক্ষীণ কান্নার আওয়াজে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের চারপাশ। বর্তমান হামের তীব্র প্রাদুর্ভাব ও এর মারাত্মক জটিলতা হিসেবে দেখা দেওয়া নিউমোনিয়া এবং শ্বাসকষ্টজনিত কারণে দেশের প্রতিটি হাসপাতালের চিত্র আজ প্রায় একই রকম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য ও বুলেটিন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত হামের প্রাদুর্ভাব ও এর জটিলতায় মোট ৯৮৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে ৮৮৪ জন মারা গেছেন হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়ার জটিলতা নিয়ে এবং ৯৯ জন ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তৈরি হওয়া বড় ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের উদ্ভাবিত সাশ্রয়ী ও জীবনরক্ষাকারী ‘বাবল সিপিপিএপি’ প্রযুক্তির দেশব্যাপী জরুরি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এই জাতীয় উদ্যোগটি পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে আইসিডিডিআরবি।

বাবল সিপিপিএপি প্রযুক্তি ও এর কার্যকারিতা:
আইসিডিডিআর,বি-র গবেষকদের পরিচালিত বাবল সিপিপিএপি প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর ফুসফুস খোলা রাখতে এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে বাবল সিপিপিএপি অত্যন্ত কার্যকর একটি কম খরচের শ্বাসপ্রশ্বাস সহায়তা ব্যবস্থা (অক্সিজেন ডেলিভারি সিস্টেম)। এটি সাধারণ ভেন্টিলেটর বা প্রচলিত অক্সিজেন থেরাপির একটি চমৎকার বিকল্প, যা অত্যন্ত সহজ ও কার্যকর পদ্ধতিতে শিশুদের শ্বাসকষ্ট দূর করতে কাজ করে।

আইসিডিডিআরবি ঢাকার হাসপাতালে ২০১৩ সাল থেকে এটি নিয়মিত সেবার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত কারণে শিশু মৃত্যুর উচ্চ হার এবং ব্যয়বহুল মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটরের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই মূলত এই সাশ্রয়ী ও টেকসই প্রযুক্তিটি তৈরি করেছেন আইসিডিডিআর,বি-র বিজ্ঞানীরা।

এর সুফল ও সুবিধাগুলো:
গবেষণায় বলছে, মারাত্মক নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় প্রচলিত কম প্রবাহের অক্সিজেন থেরাপির তুলনায় এই সাশ্রয়ী প্রযুক্তিটি মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে (প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত) কমাতে সক্ষম এবং ব্যয়বহুল মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটরের প্রয়োজনীয়তা বহুলাংশে হ্রাস করে। মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং টিকিয়ে রাখা কঠিন হওয়ায়, এই প্রযুক্তিটি বিকল্প হিসেবে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে আসছে। এর চমৎকার কার্যকারিতা এবং সহজলভ্য কাঠামোর কারণে এটি কেবল বাংলাদেশের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সীমিত সম্পদের মুখোমুখি হওয়া বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এটি সাফল্যের সঙ্গে অভিযোজিত ও ব্যবহৃত হয়েছে।

বিশেষ করে ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া এবং মালাউবির মতো জনবহুল ও স্বাস্থ্যসেবাখাতে সীমিত সুযোগের দেশগুলোতে এই বাবল সিপিপিএপি প্রযুক্তি অসংখ্য শিশুর জীবন রক্ষায় অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। এই আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি ও গবেষণার জোরালো ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তিটির ব্যাপক সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পদক্ষেপ:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান ও ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর মিছিলের মুখে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেনের নির্দেশনায় দেশজুড়ে শিশু হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ৩০ মার্চ আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহ আহমেদ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে হামজনিত নিউমোনিয়া চিকিৎসায় বাবল সিপিপিএপি ব্যবহারের প্রস্তাব করেন, যা পরবর্তীতে দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়। দেশের ৩০টিরও বেশি হটস্পট ও জনবহুল অঞ্চলের সরকারি হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে এই চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম:
মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের জন্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা সদর হাসপাতালে (যেমন—ঢাকা শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল) ধারাবাহিক হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।

আইসিডিডিআর,বি-র জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ডা. মোহাম্মাদ জোবায়ের চিশতীসহ অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের শত শত চিকিৎসক ও নার্সকে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এছাড়া, মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ ও ত্রুটি নিরসনের জন্য একটি টেলিফোন হটলাইন স্থাপন করা হয়েছে এবং ঝিপিয়েগো-এর মতো সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা বিভিন্ন জেলায় এর নিয়মিত মনিটরিং করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত:
প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহ আহমেদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠকগুলোতে জানান, হামজনিত নিউমোনিয়া চিকিৎসায় বাবল সিপিপিএপি একটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও স্কেলযোগ্য সমাধান।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) পেডিয়াট্রিক্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, ‘নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্টের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই বাবল সিপিপিএপি ব্যবহার করা উচিত’। আইসিডিডিআর,বি-র জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ডা. মোহাম্মাদ জোবায়ের চিশতীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় শিশু বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন হাসপাতালে আয়োজিত প্রশিক্ষণ সেশনগুলোতে এই প্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও কার্যকারিতা তুলে ধরে মাঠপর্যায়ে এর সঠিক প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা