ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) প্রকাশিত ‘ইমেজ অব দ্য ডে’-তে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার একটি চমকপ্রদ স্যাটেলাইট ছবি। ছবিটি দেখাচ্ছে, বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল শহরগুলোর একটি হিসেবে ঢাকা কীভাবে আশপাশের ভূপ্রকৃতি দ্রুত বদলে দিচ্ছে।

স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, ঘনবসতিপূর্ণ নগরকেন্দ্রটি ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। একসময় যে এলাকাগুলোতে কৃষিজমি ও সবুজ উদ্ভিদ ছিল, সেখানে এখন গড়ে উঠছে ভবন, সড়ক ও অন্যান্য পাকা স্থাপনা। মহাকাশ থেকে এই পরিবর্তনের ধরণ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে।
নদী ও পলিতে গড়া পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতি
ঢাকা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় অংশের একটি সমতল বন্যাপ্রবণ ভূমিতে অবস্থিত। এ অঞ্চলজুড়ে রয়েছে বহু নদী ও শাখানদী। মৌসুমি বন্যা, নদীর প্রবাহপথের পরিবর্তন এবং পলি জমার কারণে এখানকার ভূপ্রকৃতি সবসময় বদলে যায়। এখন সেই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নগরায়ণ।
শহরের ভেতর দিয়ে পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবাহিত হয়েছে ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদী। এর বাইরে বৃহত্তর অঞ্চলকে প্রভাবিত করছে পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা। এই নদীগুলো মিলে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ নদী ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছে।
যমুনা আসলে ব্রহ্মপুত্র নদের নিম্নপ্রবাহ, যা তিব্বত মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে পদ্মা হলো বাংলাদেশের ভেতরে গঙ্গার নিম্নাংশ। পরে এই দুই নদীর পানি মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে।
মৌসুমি বৃষ্টি বদলে দেয় ভূমির চেহারা
এই বিস্তীর্ণ ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব বেশি উঁচু নয়। তাই বর্ষা মৌসুমে নদীগুলো বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে আনে। কোথাও নতুন ভূমি সৃষ্টি হয়, কোথাও আবার ভাঙন দেখা দেয়। শুকনো মৌসুমে পদ্মা ও যমুনার কিছু অংশে শুকনো চর বা নদীর তলদেশও দৃশ্যমান হয়। এতে বোঝা যায়, নদীপথ কত দ্রুত বদলাতে পারে।
এই পলিমাটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষিকে সমৃদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে নদীর গতিপথ বদলে যাওয়ার কারণে স্থানীয় মানুষকে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে জীবনযাপন করতে হয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে নগরায়ণের স্পষ্ট চিহ্ন
ছবিটি ধারণ করেছে ইউরোপের পৃথিবী পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির অংশ ‘কপের্নিকাস সেন্টিনেল-২’ মিশন। এই স্যাটেলাইট পৃথিবীপৃষ্ঠের পরিবর্তন সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শহর, কৃষিজমি, বনভূমি ও জলাশয়ের পরিবর্তন নিয়মিতভাবে অনুসরণ করেন।
সেন্টিনেল-২-এর যন্ত্রপাতি মানুষের চোখে দেখা যায় না এমন আলোর অংশও শনাক্ত করতে পারে। বিশেষ করে নিকট-অবলোহিত তরঙ্গ ব্যবহার করে বিশ্লেষকেরা উদ্ভিদ, পানি ও নগর কাঠামোকে আলাদা রঙে দেখাতে পারেন। এতে উদ্ভিদ গাঢ় লাল, পানি কালচে নীল বা কালো, আর নগরাঞ্চল ধূসর রঙে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজেই বোঝা যায় কোথায় প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের জায়গা দখল করছে কংক্রিটের অবকাঠামো। একই সঙ্গে উদ্ভিদের স্বাস্থ্য ও অভ্যন্তরীণ জলাভূমির অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
ঢাকার সম্প্রসারণ এখন মহাকাশ থেকেও দৃশ্যমান
প্রকাশিত ছবিতে ঢাকার চারপাশের বিস্তীর্ণ বন্যাপ্রবণ ভূমিতে এখনো প্রচুর সবুজ এলাকা দেখা যায়। তবে এর মধ্যেই পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, শহরটি দ্রুত বাইরের দিকে বিস্তৃত হচ্ছে। নগরকেন্দ্রের আশপাশে বড় বড় এলাকা ইতোমধ্যে নির্মিত অবকাঠামোর আওতায় এসেছে।
কিছু এলাকায়, যেখানে আগে ঘন সবুজ উদ্ভিদ ছিল, সেখানে এখন খোলা মাটি, নির্মাণকাজ কিংবা নতুন পাকা স্থাপনার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। এসব পরিবর্তন থেকে ধারণা করা যায়, সেখানে আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা, সড়ক এবং অন্যান্য অবকাঠামো দ্রুত গড়ে উঠছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢাকার নগর সম্প্রসারণও দ্রুততর হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহানগর এলাকায় ৩ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। এর ফলে ঢাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে জনবহুল নগরী এবং দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল নগর অঞ্চলের একটি হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাড়ছে চাপ, বাড়ছে ঝুঁকিও
এত বড় পরিসরের নগরায়ণ নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। নতুন নতুন বসতি গড়ে ওঠায় কৃষিজমি, জলাভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে আবাসন, সড়ক, পানি ব্যবস্থাপনা এবং নগর অবকাঠামোর চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।
নদীবিধৌত ও বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে এ ধরনের দ্রুত নগর বৃদ্ধি ভবিষ্যতে পরিবেশগত ঝুঁকি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টিকেও সামনে আনতে পারে। তাই পরিকল্পিত উন্নয়ন এখন আরও জরুরি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট নজরদারি
মহাকাশ থেকে শহর পর্যবেক্ষণ করা পরিকল্পনাবিদ, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্যাটেলাইট তথ্যের মাধ্যমে জানা যায় কোথায় নগরায়ণ বাড়ছে, কোথায় সবুজ এলাকা কমছে, আর নদী ও জলাভূমি কীভাবে মানবিক কার্যক্রমের প্রভাবে বদলে যাচ্ছে।
কপের্নিকাস সেন্টিনেল-২ নিয়মিতভাবে পৃথিবীপৃষ্ঠের ছবি সংগ্রহ করে। ফলে সময়ের সঙ্গে পরিবেশগত ও নগর পরিবর্তনের একটি ধারাবাহিক রেকর্ড তৈরি হয়। নগর পরিকল্পনাবিদেরা ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় এসব তথ্য ব্যবহার করেন। পরিবেশবিজ্ঞানীরাও উদ্ভিদের স্বাস্থ্য, জলসম্পদ এবং নগর-প্রকৃতি সম্পর্ক বিশ্লেষণে এ তথ্যের ওপর নির্ভর করেন।
মহাকাশ থেকে পাওয়া এই চিত্র স্পষ্ট করে দিচ্ছে, দ্রুত বর্ধনশীল একটি শহর অল্প সময়ের মধ্যেই কীভাবে চারপাশের ভূদৃশ্য বদলে দিতে পারে।


