ঢাকারবিবার , ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

‘সমন্বিত জলবায়ু পদক্ষেপ’ রক্ষা করতে পারে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২১ সকাল

Link Copied!

মানবসভ্যতার অস্তিত্বের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং বায়ু দূষণের দ্বিমুখী সংকট। কলকারখানা, যানবহন ও জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত ক্ষতিকর কণা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস কেবল বৈশ্বিক উষ্ণতাই বাড়াচ্ছে না, বরং বিশ্ববাসীর স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) এবং ক্লাইমেট অ্যান্ড ক্লিন এয়ার কোয়ালিশন (সিসিএসি) যৌথভাবে—‘হিডেন অ্যাসেটস: দ্য ইকোনমিক অ্যান্ড হেলথ কেস ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড ক্লিন এয়ার অ্যাকশন’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বায়ু দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে যে বিশাল অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত সুফল (লুকানো সম্পদ) অর্জিত হতে পারে, তার সুদূরপ্রসারী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

জলবায়ু ও পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মপন্থা :

দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন এবং বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণকে দুটি আলাদা খাত হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ইউএনইপির এই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, এই দুটি সমস্যা মূলত একই সূত্রে গাঁথা। জীবাশ্ম জ্বালানি, মিথেন গ্যাস, এবং অন্যান্য স্বল্পস্থায়ী জলবায়ু দূষণকারী বা শর্ট-লিভড ক্লাইমেট পোলুট্যান্টস-গুলো যুগপতভাবে পরিবেশ নষ্ট করছে এবং মানুষের ফুসফুসে বিষ ছড়াচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী অনেক উপাদানই সরাসরি বায়ুর গুণমান মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটায়। তাই যদি সুনির্দিষ্ট কিছু স্বল্পস্থায়ী দূষণকারী যেমন— মিথেন, ব্ল্যাক কার্বন (কালো ধোঁয়া) এবং ট্রপোস্ফিয়ারিক ওজোন হ্রাসে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে তার সুফল দ্বিমুখী হবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন বৈশ্বিক তাপমাত্রার বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা সম্ভব হবে অন্যদিকে তেমনি কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচানো এবং স্বাস্থ্যসেবার পেছনে ব্যয় হওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্য খাতের বিশাল সুফল ও অর্থনৈতিক সাশ্রয় :

বায়ু দূষণের কারণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। স্ট্রোক, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যানসার এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টের মতো মারাত্মক রোগগুলোর অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিষাক্ত বায়ু। ইউএনইপির প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, পরিচ্ছন্ন বায়ু এবং জলবায়ু সুরক্ষায় বিনিয়োগ কোনো বাড়তি খরচ নয়, বরং এটি মানবজাতির জন্য এক বিরাট অর্থনৈতিক লাভ (লুকানো সম্পদ)।

যখন বিভিন্ন দেশের সরকার পরিচ্ছন্ন শক্তির ব্যবহার বাড়ায়, গণপরিবহনে রূপান্তর ঘটায় এবং শিল্প কারখানায় ফিল্টার বা আধুনিক প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করে, তখন বায়ু দূষণের মাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করে। এর ফলে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার যে বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়, তা থেকে অর্থনীতি রক্ষা পায়। প্রতিবেদনে হিসাব করে দেখানো হয়েছে যে, সঠিক জলবাযুস নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে যে পরিমাণ ব্যয় বাঁচানো সম্ভব, তার আর্থিক মূল্য প্রাথমিক বিনিয়োগের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা :

বায়ু দূষণের নেতিবাচক প্রভাব কেবল মানবদেহের ওপরই পড়ে না, এটি সরাসরি কৃষিজমি এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও আঘাত হানে। বিশেষ করে ট্রপোস্ফিয়ারিক ওজোন গ্যাস উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বাধা দেয় এবং ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। এর ফলে গম, ধান, ভুট্টা এবং সয়াবিনের মতো প্রধান প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু ও পরিচ্ছন্ন বায়ু অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হলে ওজোন গ্যাসের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে কৃষিজমির উর্বরতা ও ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। খাদ্য ঘাটতির শিকার উদীয়মান অর্থনীতি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি অন্যতম বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন অনিশ্চয়তার মুখে, তখন পরিচ্ছন্ন বায়ুর এই সুফল কৃষকদের জন্য এক বিশাল স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে।

বিনিয়োগের মডেল ও বৈশ্বিক কাঠামোর রূপরেখা :

ইউএনইপির এই বিশ্লেষণে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের অভাব রয়েছে, সেখানে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সুসমন্বিত ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল ধনী দেশগুলোর একরৈখিক আর্থিক সাহায্য নয়, বরং জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতকে একসাথে জুড়ে যৌথ সুবিধার ভিত্তিতে পরিকল্পনা সাজাতে হবে।

সরকারগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর থেকে ক্ষতিকর ভর্তুকি তুলে নিয়ে সেই অর্থ নবায়নযোগ্য শক্তি, আধুনিক গণপরিবহন এবং টেকসই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে। পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির প্রসার ঘটালে গ্রিন জবস বা সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:

ইউএনইপির এই বৈশ্বিক প্রতিবেদনের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান পরিবেশগত বাস্তবতার রয়েছে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ মিল। বাংলাদেশ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা এবং এর আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় রয়েছে। শীতকালে শুষ্ক আবহাওয়া, ইটভাটার ধোঁয়া, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজের কারণে এখানকার বাতাস মানুষের শ্বাস নেওয়ার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এর পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র অভিঘাতে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো লেগেই আছে। দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর বায়ু দূষণজনিত রোগবালাইয়ের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে। অসংখ্য মানুষ ফুসফুস ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য ইউএনইপির এই স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সুফলের ধারণাটি সময়োপযোগী। দেশে যদি জীবাশ্ম জ্বালানি ও ইটভাটার মতো দূষণের উৎসগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ জ্বালানির প্রসার ঘটানো হয়, তবে তা শুধু কার্বন নিঃসরণ কমাবে না, বরং দেশের কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আমূল কমিয়ে দেবে।

জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন এবং বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণকে আলাদা না দেখে যদি একটি সমন্বিত নীতি হিসেবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক উদ্যোগের পূর্ণ সুফল ঘরে তুলতে পারবে। টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিধারা বজায় রাখতে পরিচ্ছন্ন বায়ু ও জলবায়ু সুরক্ষায় এখনই কার্যকর ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

উপায় এবং স্প্লিটপে-এর কৌশলগত অংশীদারিত্ব: বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফি পরিশোধ হবে আরও সহজ

From Pixels to Perspectives: OPPO & BUP Join Hands to Spotlight Young Visual Storytellers

তরুণদের সৃজনশীলতার নতুন মঞ্চ ‘স্ফূরণ ৬.০’, থাকছে নানা সুযোগ

এসডিজি বাস্তবায়নে গতি বাড়িয়ে দারিদ্র্য ও বৈষম্য অবসানে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার দাবি

Lifebuoy Friendship Hospital has provided healthcare services to over 800,000 patients in remote riverine island areas

দুর্গম চরাঞ্চলে ৮ লাখের বেশি রোগীকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছে লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল

চট্টগ্রামের বাজারে নতুন ফল ‘সাম্মাম’, কেজি ১০০-১৫০ টাকা

টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ার আহ্বান

পটুয়াখালীতে বাস-অটোরিকশা সংঘর্ষ, খাদে পড়ে নিহত ৪

ভোরেই ঢাকায় তুমুল বৃষ্টি, সঙ্গে বজ্রপাত

ভোরের মুষলধারে বৃষ্টিতে ডিএসসিসির কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা

সারাক্ষণ ক্লান্তিবোধ করেন? জেনে নিন অবসাদের ১২টি বড় কারণ