
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবার এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। মরণঘাতী ব্রেন টিউমার বা মস্তিষ্কের ক্যানসার শনাক্ত করতে যেখানে আগে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগত, সেখানে নতুন একটি এআই প্রযুক্তি মাত্র কয়েক মিনিটেই রোগ নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেছেন জার্মানির গবেষকেরা।
জার্মানির হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি হসপিটাল এবং জার্মান ক্যানসার রিসার্চ সেন্টার–এর বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, নতুন এই এআই সিস্টেমের নাম “HETAIROS”। এটি মাত্র ১২ মিনিটে ব্রেন টিউমার শনাক্ত ও তার ধরন নির্ধারণ করতে পারে। যেখানে প্রচলিত পরীক্ষায় এই প্রক্রিয়ায় গড়ে প্রায় ১২ দিন সময় লাগে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক জার্নাল Nature Cancer–এ। সেখানে বলা হয়, ব্রেন টিউমারের সঠিক চিকিৎসা নির্ধারণের জন্য আণবিক বা মলিকুলার বৈশিষ্ট্য জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা সাধারণত জটিল ও ব্যয়বহুল পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।
কীভাবে কাজ করে HETAIROS
গবেষকদের মতে, নতুন এআই সিস্টেমটি তৈরির আগে চারটি মহাদেশের ৯ হাজার ৬০৬ জন রোগীর ১১ হাজারের বেশি ডিজিটাল টিস্যু স্লাইড দিয়ে এআইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী মস্তিষ্কের টিউমারের ১০২টি আণবিক সাবটাইপ আলাদা করতে সক্ষম হয়েছে।
এআইটি সাধারণ টিস্যু সেকশন বা কোষের নমুনা বিশ্লেষণ করেই ক্যানসারের আণবিক তথ্য বের করতে পারে, যা চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সহজ করে তুলতে পারে বলে গবেষকদের দাবি।
নির্ভুলতা ও পরীক্ষার ফলাফল
গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে এআইটির নির্ভুলতা ছিল ৮৭ থেকে ৮৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিকভাবে ৫ জন অভিজ্ঞ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে তুলনামূলক পরীক্ষায় ২১০টি জটিল নমুনা বিশ্লেষণে মানব বিশেষজ্ঞরা সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছেন মাত্র ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে। সেখানে এআই সিস্টেমটি ৬৮ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক ফলাফল দিয়েছে।
গবেষকদের মন্তব্য
মরিটজ গার্স্টুং বলেন, ডিজিটাল প্যাথলজিতে এআই–ভিত্তিক এই প্রযুক্তি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তার মতে, ভবিষ্যতে জটিল ও ব্যয়বহুল পরীক্ষাগুলো আরও সহজলভ্য হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে গবেষণার প্রধান লেখক দারুই জিন জানান, এআই সরাসরি টিস্যু স্লাইড থেকে ক্যানসারের আণবিক তথ্য বের করতে সক্ষম, যা ক্যানসার নির্ণয়ের পুরো প্রক্রিয়াকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করছে।
ফেলিক্স সাহম বলেন, আধুনিক এআই এখন এমন সূক্ষ্ম কোষগত প্যাটার্নও শনাক্ত করতে পারছে, যা অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের পক্ষেও আলাদা করা কঠিন।
দ্রুত ফলাফল ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
গবেষকদের মতে, বর্তমানে যেখানে সম্পূর্ণ আণবিক পরীক্ষার ফলাফল পেতে প্রায় ১২ দিন লাগে, সেখানে ডিজিটাল স্লাইড বিশ্লেষণের পর HETAIROS মাত্র ১২ মিনিটেই প্রাথমিক ফলাফল দিতে পারে। নমুনা প্রস্তুতির সময়সহ হিসাব করলে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট পাওয়া সম্ভব।
এছাড়া, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত টিউমার টিস্যু না থাকলেও এই এআই সামান্য নমুনা থেকেই রোগ শনাক্ত করতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। যেহেতু এটি সাধারণ টিস্যু স্লাইডের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে, তাই অতিরিক্ত ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাতে পারে। দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং তুলনামূলকভাবে নির্ভুল এই এআই সিস্টেম বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবার চিত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
সূত্র: দ্য সান নিউজ