
দেশের সড়কে দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকিই নয়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব যানবাহনে ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিশু, গর্ভবতী নারী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নীরব বিপদ সৃষ্টি করছে।
তাদের মতে, ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবহৃত ব্যাটারি বর্তমানে দেশে সিসা দূষণের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি না বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে এটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। প্রতিটি রিকশায় গড়ে চারটি সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়, যার আয়ুষ্কাল সাধারণত নয় মাস থেকে এক বছর। মেয়াদ শেষ হলে বিপুল পরিমাণ ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হয় এবং এসবের বড় অংশ অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত কারখানায় পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়।
পরিবেশবিদদের ভাষ্য, এসব কারখানায় খোলা পরিবেশে ব্যাটারি ভেঙে সিসা সংগ্রহ করা হয়, যা মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহৃত ব্যাটারির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই অনিরাপদ ও অবৈধ উপায়ে রিসাইক্লিং করা হয়। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুতর প্রভাব ফেলে এবং তাদের শেখার ক্ষমতা ও আইকিউ কমিয়ে দিতে পারে।
পিওর আর্থের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাস বলেন, শিশুদের শরীর বড়দের তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি সিসা শোষণ করে। ফলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের নামে যত্রতত্র কারখানা গড়ে ওঠায় মাটি দূষিত হচ্ছে। সেই দূষিত মাটিতে উৎপাদিত খাদ্য এবং প্রাণীকুলও দূষণের প্রভাবের বাইরে থাকছে না।
আইসিডিডিআরবির গবেষক ড. মাহাবুবুর রহমানের মতে, সিসা শুধু মানুষের শরীরেই নয়, মাটি, প্রাণী ও কৃষিপণ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। তাই এই দূষণের উৎস বন্ধ করা ছাড়া কার্যকর কোনো বিকল্প নেই।
অন্যদিকে পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক জানিয়েছেন, অবৈধ ব্যাটারি গলানোর কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিবেশ অধিদফতর, ভোক্তা অধিকার অধিদফতর এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে ঝুঁকিপূর্ণ উৎসগুলো চিহ্নিত ও বন্ধে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায় কঠোর আইন প্রয়োগ, নিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে সিসা দূষণের এই নীরব সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এর প্রভাব দেশের জনস্বাস্থ্য, শিশুদের মেধা বিকাশ এবং সামগ্রিক পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।