ঢাকাবুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

প্রচার আর অর্থের অভাবে ধুঁকছে জাতিসংঘের ‘ক্যালি ফান্ড’

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:৫১ বিকাল

Link Copied!

প্রকৃতির বৈচিত্র্য রক্ষা এবং তা থেকে অর্জিত সুফল স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আদিবাসীদের মধ্যে ন্যায্যভাবে বন্টনের মহৎ উদ্দেশ্যে গঠিত জাতিসংঘের বিশেষ তহবিল ‘ক্যালি ফান্ড’ বর্তমানে অস্তিত্ব সংকট ও স্থবিরতার মুখে পড়েছে। বিশ্বজুড়ে জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যেখানে হাজার হাজার কোটি ডলারের তহবিল প্রয়োজন, সেখানে এই অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বৈসম্যহীন বৈশ্বিক উদ্যোগটি চালুর পর থেকে প্রচারের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর উদাসীনতার কারণে কাঙ্খিত গন্তব্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে।

২০২৪ সালে কলম্বিয়ার কালিতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলনে ঐতিহাসিক এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই ‘ক্যালি ফান্ড’ গঠন করা হয়েছিল। এই তহবিলের মূল লক্ষ্য ছিল—বিশ্বজুড়ে গাছপালা, প্রাণী, অণুজীব ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানের ডিজিটাল জেনেটিক তথ্য বা ডিজিটাল সিকোয়েন্স ইনফরমেশন (ডিএসআই) ব্যবহার করে যেসব ওষুধ প্রস্তুতকারক, প্রসাধন নির্মাতা, কৃষিভিত্তিক বহুজাতিক এবং বায়োটেক কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হয়, তারা যেন তাদের আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ এই তহবিলে জমা দেয়।

আন্তর্জাতিক এই কাঠামোর আওতায় পরিকল্পনা ছিল যে, বিশ্বব্যাপী সংশ্লিষ্ট বৃহৎ কর্পোরেশনগুলোর কাছ থেকে প্রতি বছর অন্তত ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলার সংগ্রহ করা হবে। সংগৃহীত এই বিশাল অর্থের অন্তত অর্ধেক সরাসরি ব্যয় করার কথা ছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আদিবাসী সম্প্রদায় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণে, যারা মূলত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজেদের রক্ত ও ঘাম দিয়ে এই জীববৈচিত্র্যকে সুরক্ষা দিয়ে আসছেন।

তবে পরিকল্পনা আর বাস্তবের সমীকরণ যে সবসময় মেলে না, ক্যালি ফান্ডের বর্তমান করুণ দশা তারই এক জলন্ত প্রমাণ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তহবিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুদানের জন্য উন্মুক্ত করার পর থেকে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত এতে মাত্র দুটি কোম্পানি থেকে মোটে ৬ হাজার মার্কিন ডলার জমা পড়েছে। এক বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এই ৬ হাজার ডলারের পরিসংখ্যান কেবল হতাশাজনকই নয়, বরং গোটা প্রক্রিয়াটিকে একধরনের স্থবির পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। অনুদান দেওয়া এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি হলো যুক্তরাজ্যের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভিত্তিক স্টার্টআপ, যারা আইসব্রেকার বা বরফ গলানোর প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে মাত্র ১ হাজার ডলার প্রদান করেছে। আরেকটি কোম্পানি নামমাত্র কিছু অর্থ সহায়তা দিলেও বড় কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা জায়ান্ট কর্পোরেশন এখনও পর্যন্ত এই তহবিলে বড় অংকের অর্থ প্রদান করেনি।

এই সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রচারের মারাত্মক অভাবকে। জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য চুক্তির (সিবিডি) নির্বাহী সচিব আস্ট্রিড শোমাকার সম্প্রতি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, বিশ্বজুড়ে বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও করপোরেট দুনিয়ায় এই তহবিল সম্পর্কে প্রায় কেউ জানেই না বললেই চলে। এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন বৈচিত্র্যময় আর্থিক যন্ত্র হওয়ায় এর পরিচিতি এখনও আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে পড়েনি।

এছাড়া বড় মাপের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্যবসায়িক ঝুঁকি এড়াতে প্রথম পদক্ষেপ বা পাইওনিয়ার হিসেবে অনুদান দিতে চরম দ্বিধাবোধ করছে। কোনো কোম্পানি যদি এককভাবে বিশাল অঙ্কের অর্থ এই তহবিলে বিনিয়োগ করতে যায়, তবে তাদের শেয়ারহোল্ডারদের কাছে এর সুনির্দিষ্ট লাভ বা জবাবদিহিতা কী হবে, সে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছে বলে জানান ওই নির্বাহী সচিব।

প্রচার সংকট ছাড়াও এই তহবিলের পথচলাকে রুদ্ধ করে রেখেছে বেশ কিছু জটিল প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা। ক্যালি ফান্ডের সার্বিক অপারেশনাল ম্যানুয়াল, নিয়মকানুন, পর্যালোচনা পদ্ধতি এবং অনুদান প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর জন্য কোনো স্পষ্ট সার্টিফিকেশন বা স্বীকৃতি ব্যবস্থা এখনও খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো আইনি গ্যারান্টি না থাকায় কোম্পানিগুলো বুঝতে পারছে না যে এই ফান্ডে টাকা দিলে তাদের আইনি বা বাণিজ্যিক দিক থেকে ঠিক কী সুবিধা মিলবে। বিশ্বের অনেক দেশ আবার বৈশ্বিক এই তহবিলে সরাসরি অর্থ জমা দেওয়ার চেয়ে নিজেদের মতো করে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করাকে বেশি নিরাপদ মনে করছে।

তহবিলের এই ধীরগতির ফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি খাচ্ছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আদিবাসী ও স্থানীয় সম্প্রদায়গুলো। জাতিসংঘের মূল সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই তহবিলের অর্থের অর্ধাংশ আদিবাসীদের স্বনির্ধারিত অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আদিবাসী প্রতিনিধি ও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন বা পরিকাঠামো তৈরির অজুহাতে তহবিল গঠনকে দীর্ঘায়িত করা যাবে না; কারণ অর্থায়ন ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন বা সুফল বণ্টন কেবল কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।

সূত্র: আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘মংবাগে’

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

উপায়ের ‘স্বপ্নের ওমরাহ’ ক্যাম্পেইনে পুরস্কার পেলেন ৩ ডিস্ট্রিবিউশন পার্টনার

সাতক্ষীরায় ৭৫ শতাংশ জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার তীব্র খাদ্য সংকটে

মিরপুর বেড়িবাঁধে বাস-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ৪

হাসপাতাল নেই ৬০ গ্রামে, অসুস্থ হলে আট ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি

চাঁদপুরে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারে ৬ যানবাহনকে জরিমানা

ঢাকায় শুষ্ক আবহাওয়া, কমতে পারে দিনের তাপমাত্রা

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু রক্ষায় ১২ সংস্থার সঙ্গে ইউএনডিপির চুক্তি

সড়ক দুর্ঘটনার আচরণগত ঝুঁকি নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে মতবিনিময় সভা

২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরও ৬ মৃত্যু

ভিভো ভি৮০: নতুন রং ও নতুন ডিজাইনে আসছে নতুন চমক

vivo V80: Arriving in a New Colour with a New Design

ক্রোনস ও আলসারেটিভ কোলাইটিস: দুই রোগের পার্থক্য, লক্ষণ ও চিকিৎসা