
বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের পোলট্রি মুরগির মাংসে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। লন্ডনের বিখ্যাত রয়েল ভেটেরিনারি কলেজের (আরভিসি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকরা বলছেন, পশুখাদ্য ও চিকিৎসায় এসব ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার মানবদেহে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা কার্যকারিতা হারানোর ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘পোলট্রি নিউজ’-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এতে সার্বিক সহযোগিতা ও অর্থায়ন করেছে ‘ইউকে রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন গ্লোবাল চ্যালেঞ্জেস রিসার্চ ফান্ড’ (ওয়ান হেলথ পোলট্রি হাব)।
গবেষণার পটভূমি:
খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব যাচাই করতে গবেষক দল ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে মোট ৫৫৮টি মুরগির বুকের মাংসের নমুনা সংগ্রহ করেন। পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত এই নমুনাগুলোর একটি অংশ নেওয়া হয়েছিল সরাসরি বাজারজাতের উপযোগী মুরগি থাকা বিভিন্ন খামার থেকে এবং বাকি অংশ সংগ্রহ করা হয়েছিল স্থানীয় বিভিন্ন বাজারের বিক্রয়কেন্দ্র থেকে।
সংগৃহীত নমুনাগুলো পরবর্তীতে অধিকতর পরীক্ষার জন্য সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রায় ৬৯ ধরনের ভেটেরিনারি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের উপস্থিতি ও মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণার ফলাফল:
পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, উন্নয়নশীল এই দেশগুলোর পোলট্রি মাংসে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের উপস্থিতি নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে, কিছু বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা নমুনায় ৩ দশমিক ৭ থেকে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পাওয়া গেছে। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, একই সময়সীমায় (২০২১-২০২২) ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মাংসে এই হার ছিল গড়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ থেকে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, উন্নত বিশ্বের তুলনায় এই অঞ্চলে পোলট্রি মাংসে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের দূষণের মাত্রা কয়েকশো গুণ বেশি।
দূষণের সম্ভাব্য কারণ:
বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খামারিরা নিয়ম না মেনে মুরগি জবাইয়ের ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ প্রয়োগ করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের নির্ধারিত ‘উইথড্রয়াল পিরিয়ড’ বা ওষুধ প্রয়োগ বন্ধের নির্দিষ্ট সময়সীমা মানা হয় না। এর ফলে মাংসের মধ্যে ক্ষতিকর ওষুধের অবশিষ্টাংশ থেকে যায়। এ ছাড়াও, মুরগির বাণিজ্যিক খাদ্য এবং পানীয় জলের মাধ্যমেও এই দূষণ পুরো খামারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ করণীয়:
গবেষণার প্রধান গবেষক অধ্যাপক পেলিগ্যান্ড এই উদ্যোগকে একটি ‘যুগান্তকারী গবেষণা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, এতদিন এশিয়ায় একই মানদণ্ডে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অবশিষ্টাংশ পরিমাপের এমন সুনির্দিষ্ট ও বিস্তৃত তথ্য ছিল না। তিনি আশা করেন, এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশের পর ভেটেরিনারি খাতে এসব ওষুধের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বাড়াবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তার মান উন্নত করতে নীতিনির্ধারকদের বাধ্য করবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়মতো যথাযথ ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে পোলট্রি মাংসে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের এই মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি মানবদেহে প্রবেশ করে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করতে পারে। সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারে সরকারি তদারকি আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।