
নগরীর ঐতিহাসিক লালদীঘির মাঠে চলমান বৃক্ষমেলায় দেশীয় ফলদ ও ঔষধি গাছের চারার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। বিশেষ করে আম, জাম, আমড়া, আতা, পেয়ারা, বরই, লেবু, আমলকি, হরিতকি, বহেরা ও অড়বরইয়ের মতো দেশীয় প্রজাতির গাছের চারার চাহিদা সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন নার্সারি মালিকরা।
মেলায় অংশ নেওয়া একটি নার্সারির স্বত্বাধিকারী জানান, স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা দলবেঁধে এসে বিভিন্ন ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা কিনছেন। এসব চারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা ও আশপাশে রোপণ করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর সরকারি উদ্যোগ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও ব্যক্তিপর্যায়ে বৃক্ষরোপণের আগ্রহ বাড়ছে। ফলে দেশীয় ও প্রায় বিলুপ্তপ্রায় ঔষধি গাছের চারার চাহিদাও বেড়েছে।
বৃক্ষমেলা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ছিল মূলত আনুষ্ঠানিকতা নির্ভর। কয়েকটি চারা লাগিয়ে ছবি তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত অনেক কার্যক্রম। কিন্তু বর্তমানে সচেতনতা, প্রচারণা ও মনিটরিং বৃদ্ধির কারণে গাছ লাগানো ধীরে ধীরে মানুষের ব্যক্তিগত অভ্যাস ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে।
গত ১১ আগস্ট বৃক্ষমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর সরকারি লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কোথায় কত গাছ লাগানো হচ্ছে তারও সুনির্দিষ্ট হিসাব রাখা হবে।
মেলায় অংশ নেওয়া ‘ইসলামাবাদ নার্সারি’র স্বত্বাধিকারী মো. আবদুর রহিম বলেন, শহরে জায়গার অভাব থাকায় অনেকেই এখন ছাদবাগানের দিকে ঝুঁকছেন। ছাদে আম, জাম, আমড়া, কামরাঙ্গা, পেয়ারা, লিচু, জলপাই, সফেদা, ডালিমসহ বিভিন্ন ফলদ গাছের পাশাপাশি সবজি ও মসলা জাতীয় উদ্ভিদও চাষ করছেন।
তিনি জানান, দেশীয় ফলদ গাছের চারা আকার ও জাতভেদে ২০০ টাকা থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সবজির চারা ৩০ থেকে ১২০ টাকা এবং বিদেশি ফলের চারা ৮০০ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
মেলায় গাছের চারার পাশাপাশি ছাদবাগানের জন্য মাটির টব, প্লাস্টিক কন্টেইনার, বাগান পরিচর্যার সরঞ্জাম, সার, কীটনাশক ও পানি ছিটানোর যন্ত্রও বিক্রি হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ২০ থেকে ২৫টি নার্সারির স্টলে সারি সারি সাজানো বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চারায় পুরো লালদীঘি মাঠ সবুজে ভরে উঠেছে। দর্শনার্থীরা গাছের জাত, ফলন, পরিচর্যা ও ফল ধরার সময় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে চারা কিনছেন।
‘ফতেয়াবাদ নার্সারি’র স্বত্বাধিকারী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে ফুল ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চারা বেশি বিক্রি হলেও এখন ফলদ গাছের চারার চাহিদা অনেক বেড়েছে। মানুষ এখন গাছকে শুধু সৌন্দর্যের নয়, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবেও বিবেচনা করছে।
মেলায় গাছ কিনতে আসা পাঁচলাইশের বাসিন্দা তানজিলা আক্তার বলেন, বাসায় জায়গা না থাকায় তিনি ছাদে বাগান করার পরিকল্পনা করেছেন। এজন্য আম, লেবু, পেয়ারা ও কামরাঙার চারা কিনতে এসেছেন।
মেরন সান কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন, একটি গাছ লাগানো মানে শুধু নিজের জন্য নয়, দেশের পরিবেশের জন্যও অবদান রাখা। তিনি প্রধানমন্ত্রীর ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, এই কর্মসূচি সফল হলে দেশ আরও সবুজ ও পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠবে।
এদিকে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। জুলাই শহীদদের স্মরণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এতে বৃক্ষরোপণকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
তবে শুধু গাছ লাগালেই হবে না, সেগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নগর বিএনপির সাবেক সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আলমগীর নূর বলেন, গাছ লাগানোর পাশাপাশি সঠিক পরিচর্যা না করলে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। তাই সরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে রোপণ করা গাছের নিয়মিত পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের আশা, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার এই আগ্রহ অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে দেশের পরিবেশ আরও বাসযোগ্য ও সবুজ হয়ে উঠবে।