ঢাকাশনিবার , ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি পার হলেই ধ্বংসের মুখে পড়বে পৃথিবী: জাতিসংঘের হুঁশিয়ারি

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩০ সকাল

Link Copied!

ক্রমবর্ধমান বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের লাগামহীন গতি মানবসভ্যতাকে এক অভূতপূর্ব ও অপরিবর্তনশীল ধ্বংসের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)-এর সদ্য প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির নির্ধারিত নিরাপদ সীমা অর্থাৎ ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর অক্ষত রাখা সম্ভব নয়।

আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই সীমা আনুষ্ঠানিকভাবে অতিক্রম হয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। উত্তর গোলার্ধে সম্প্রতি রেকর্ড ভাঙা দাবদাহ, শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত জনপদ এবং দাবানলের লেলিহান শিখা বিশ্ববাসীকে এক নির্মম ভবিষ্যতের চরম বার্তা দিয়ে যাচ্ছে।

মানবতার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই :
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ বিষয়ে জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের এই লড়াই মূলত মানবতারই লড়াই।’ ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বিশ্বনেতারা বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক নীতি ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে বিশ্ব তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে।

জাতিসংঘের শীর্ষ এই কর্মকর্তা কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মানবজাতি এখন এমন এক বিপজ্জনক গতিতে এগিয়ে চলেছে, যেখানে জলবায়ু বিপর্যয় এড়ানোর শেষ সীমাগুলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ভয়াবহ অভিঘাত :
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাপমাত্রা যদি একবার ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে অবস্থান করে, তবে এর কোনো ইতিবাচক পরিণতি বা নিস্তার নেই। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন জানিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের ধ্বংসাত্মক প্রভাবগুলো এখন অনেক দ্রুত আঘাত হানছে, বহুগুণ বেশি শক্তিতে আছড়ে পড়ছে এবং দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

তাপমাত্রার প্রতিটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ বা অতিরিক্ত বৃদ্ধি মানেই হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি, কোটি মানুষের জীবিকা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য নজিরবিহীনভাবে বেড়ে যাওয়া এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্রকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া। সবচেয়ে আশাবাদী ও অনুকূল বৈশ্বিক পূর্বাভাস অনুযায়ীও, বর্তমান পরিকল্পনাগুলো শতভাগ বাস্তবায়িত হলেও শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব উষ্ণতা অন্তত ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে ঠেকবে।

টিপিং পয়েন্ট ও অপরিবর্তনশীল ক্ষতি :
১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের এই নিরাপদ সীমা অতিক্রম করার অর্থ হলো জলবায়ু ব্যবস্থার অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং স্পর্শকাতর কিছু মোড় বা ‘টিপিং পয়েন্ট’-এ পৌঁছে যাওয়া। এর ফলে এমন কিছু স্থায়ী ও অপরিবর্তনশীল পরিবর্তন ঘটে যাবে যেখান থেকে আর পেছনে ফিরে আসার কোনো উপায় থাকবে না। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই বিপদের মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রধান প্রধান বরফ চাদর ও হিমবাহের বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা, অ্যামাজন রেইনফরেস্টের স্থায়ী অবক্ষয় বা ধংস, এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিচালনাকারী আটলান্টিক মহাসাগরীয় সমুদ্রস্রোত ব্যবস্থার চরম বিঘ্নতা। এর পাশাপাশি ছোট ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র এবং নিচু উপকূলীয় প্রধান শহরগুলো সমুদ্রের পানির নিচে চিরতরে তলিয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

বিপর্যয় থেকে উত্তরণের রূপরেখা :
তবে বিজ্ঞানীরা ও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা সাময়িকভাবে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে গেলেও (ওভারশুট), শতাব্দির শেষ নাগাদ কঠোর ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে পুনরায় তাকে নিরাপদ সীমার নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি বিশেষ ‘ওভারশুট, পিক অ্যান্ড ডিক্লাইন’ বা সাময়িক অতিক্রম, সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো এবং পরবর্তীতে তা হ্রাসের পথ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। এর জন্য বিশ্বের সব দেশকে তাদের প্রচলিত উচ্চাভিলাষের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি মৌলিক খাতে পরিবর্তন আনতে হবে।

করণীয় ও বিশ্ববাসীর প্রতি চূড়ান্ত আহ্বান :
প্রথমত, অবিলম্বে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পুরোপুরি গুটিয়ে ফেলতে হবে এবং বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপ্লব ঘটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্বল্পমেয়াদি গ্রিনহাউস গ্যাস, বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলে মিথেন দূষণের মাত্রা দ্রুত ও ব্যাপক হারে কমাতে হবে। তৃতীয়ত, বনভূমি, ভূমি এবং মহাসাগর সুরক্ষার মাধ্যমে পৃথিবীর নিজস্ব কার্বন শোষণ ও ধারণ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, নেট-জিরো বা কার্বন শূন্যে পৌঁছানোর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণ বা সিকোয়েস্ট্রেশনের দীর্ঘমেয়াদি ও সুশাসিত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পঞ্চমত, উন্নত ও শিল্পোন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নিজেদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব স্বীকার করে অভিযোজন অর্থায়ন অন্তত তিন গুণ বাড়াতে হবে, যাতে গরিব ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এই মহাদুর্যোগের অভিঘাত মোকাবিলা করতে পারে।

বিজ্ঞান আজ বিন্দুমাত্র রাখঢাক না করে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু সংকট মোকাবেলার সমস্ত প্রযুক্তিগত সমাধান মানবজাতির হাতের নাগালেই রয়েছে। এখন কেবল প্রয়োজন নীতিনির্ধারকদের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন। ধরিত্রীকে বাঁচাতে হলে কথার রাজনীতি ছেড়ে বিশ্বকে এখনই একযোগে কাজের মাঠে নেমে পড়তে হবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য মোকাবিলায় ‘কাঠমান্ডু ঘোষণা’ গ্রহণ

২০৩৪ সালের মধ্যে জ্বালানি কাঠামো নিশ্চিত করা হবে: অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা

বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে পদ্মার পানি, প্লাবিত চরাঞ্চল

চার দফা কমার পর আবার বাড়ল স্বর্ণের দাম

ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেড় হাজার কর্মী নিয়ে ডিএনসিসির বিশেষ অভিযান

মাধবপুরে বাস-পিকআপ সংঘর্ষে নিহত ১

আজ থেকে সারাদেশে তিন মাসের ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান

ডিএনসিসিতে আজ থেকে বাড়ি বাড়ি ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান

বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, ৪ সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

মতলবে বাসের ধাক্কায় অটোরিকশার নারী যাত্রী নিহত, আহত ৪

vivo V80 Lite Makes a Strong Market Debut with Attractive Offers

বাজারে এসেই নজর কাড়ছে ভিভো ভি৮০ লাইট