রাজধানীর সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা কমাতে তথ্যনির্ভর উদ্যোগ জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, ঢাকা শহরের সড়কে ২০২২ ও ২০২৩ সালে ৫৪০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৬ শতাংশই পথচারী। দিনের চেয়ে রাতের ফাঁকা সড়কেই বেশি প্রাণ ঝরছে, যার মূল কারণ অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া বাস-ট্রাক। তাই সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে পুনঃনকশা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলে জানায় সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) সভাকক্ষে ‘Road Safety Situation in Dhaka’ (ঢাকার সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি) শীর্ষক এক প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচন করেন।

ডিএনসিসি ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যৌথ উদ্যোগে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিস এবং সার্বিক সহযোগিতায় ছিল ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি (বিআইজিআরএস)। ডিএমপির বিভিন্ন থানায় নথিভুক্ত জিডি ও মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে এটি তৈরি করা হয়।
মৃত্যুর পরিসংখ্যান ও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা
অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন বিআইজিআরএস-ঢাকার সার্ভিল্যান্স কোঅর্ডিনেটর ডা. তানভীর ইবনে আলী। প্রতিবেদনের মূল তথ্যগুলো হলো:
নিহতদের ধরন: মোট ৫৪০ জন নিহতের মধ্যে ৫৬% (৩০৩ জন) পথচারী, ২৪% (১২৮ জন) মোটরসাইকেল আরোহী এবং ৮% (৪১ জন) রিকশা ব্যবহারকারী।
লিঙ্গ ও বয়স: নিহতদের ৮০ শতাংশই পুরুষ। সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সীরা।
ঝুঁকিপূর্ণ স্পট: যাত্রাবাড়ী ও বিমানবন্দর মোড়ে সর্বোচ্চ ১২ জন করে এবং আব্দুল্লাহপুর মোড়ে ১০ জন মারা গেছেন।
সবচেয়ে ভয়ংকর রুট: ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আর্মি গলফ ক্লাব বাসস্ট্যান্ড থেকে আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার সড়কে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে (প্রতি কিলোমিটারে ৮ জনের বেশি)।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ঢাকা শহরের সড়কে পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীদের মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। দিনের চাইতে রাতে বেশি মানুষ মারা যায়। তখন যানজট থাকে না, সড়কে মানুষও কম থাকে। তারপরও রাতে বেশি মানুষ মারা যাবার প্রধান কারণ যানবাহনের অতিরিক্ত গতি।
ডিএনসিসি প্রশাসক আরও বলেন, ফুটপাথ বেদখল বা ব্যবহার উপযোগী না থাকার কারণে পথচারী সড়কে চলাচল করতে বাধ্য হয়। এ সময় গাড়ি পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। ফুটপাথে যেনো কেউ বেদখল না করে সেজন্য নগরবাসীর সহায়তা প্রয়োজন। পথচারীরা সড়ক পারাপার হতেও দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় মারা যান। এজন্য যত্রতত্র সড়ক পারাপার হতে পথচারীদের বিরত থাকা দরকার। নির্দিষ্ট স্থান দিয়ে, জেব্রা ক্রসিং বা ফুটওভারব্রিজ দিয়ে সড়ক পার হলে পথচারীদের ঝুঁকি কমবে।
প্রশাসক বলেন, এ প্রতিবেদনে যেসব সড়ক ও মোড়ে বেশি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউটের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন ডিজাইনের মাধ্যমে সেসব মোড় নিরাপদ করা হবে।
ডিএনসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে, সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। যারা সড়ক ব্যবহার করেন, পথচারী, যাত্রী, চালক – সবাই সড়ক ব্যবহারে সচেতন হলে এবং আইনমেনে চললে সড়ক অনেকাংশে নিরাপদ হয়ে উঠবে।
ডিএনসিসি’র প্রধান প্রকৌশলী ব্রি. জে. সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্যউপাত্ত খুব জরুরি। তথ্যের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হলে তা সড়ক নিরাপত্তায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এ প্রতিবেদনে ডিএনসিসি’র আওতাধীন উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক বা মোড়গুলো নিরাপদ করার জন্য পুনঃনকশা করা হবে যেনো সড়কে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমে। বিশেষ করে, পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা, উন্নত ও প্রশস্ত ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিংয়ের ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে।
বিআইজিআরএস-এর সমন্বয়কারী মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলিতে অবকাঠামোগত পরিবর্তন ও যথাযথভাবে সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগের মাধ্যমে পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ডিএমপি ও ডিএনসিসির উদ্যোগে ফুটপাথ থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে পথচারীদের নিরাপদ চলাচল উপযোগী করা হচ্ছে।
ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যবস্থাপক খালিদ মাহমুদ বলেন, সড়ক পরিহবন আইন ২০১৮ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার বিষয়ক গাইডলাইন, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ নির্দেশিকা প্রণীত হয়েছে – এসব আইন, বিধি ও নির্দেশিকার বাস্তবায়ন জরুরি।
ডিএনসিসি’র অতি. প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম বলেন, ডিএনসিসি বেশ কয়েকটি সড়কের ক্রসিং, ইন্টারসেকশন এবং ইউ-লুপ (ইউ-টার্ন) ও স্কুলসংলগ্ন সড়কের সংস্কার করার মাধ্যমে নিরাপদ করেছে। পথচারীবান্ধব সড়ক অবকাঠামো নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের টেকনিক্যাল এডভাইজর আমিনুল ইসলাম সুজন বলেন, মৃত্যু কেবল সংখ্যা নয়, বরং যারা তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে তাদের জন্য এটা সারাজীবনের যন্ত্রণা। সেজন্য রোড ক্র্যাশ প্রতিরোধে গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রিত গতিতে যানবাহন চালানোর বিষয়ে সচেতন করার জন্য জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন জরুরি।
অন্যান্যের মধ্যে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ)’র সিনিয়র রোড সেফটি স্পেশালিস্ট মো. মামুনুর রহমান, বিআরটিসি’র মহাব্যবস্থাপক (পরিচালনা) মেজর মো. নিজাম উদ্দিন,নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সহ-সভাপতি এসএম আজাদ হোসেন, ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট-এর কনসালন্টে ফারজানা ইসলাম তমা, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর রহমান, সেন্টার ফর ইনজ্যুরি প্রিভেনশন এন্ড রিসার্চ-বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার কাজী বোরহান উদ্দিন বক্তব্য রাখেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ডা. ওয়াতিন আলম, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ ওয়ালি নোমান, ঢাকা আহছানিয়া মিশনের কমিউনিকেশন অফিসার তারিকুল ইসলাম, ডিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার (গুলশান) তানভীর আহমেদ, ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (গুলশান জোন) এর মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ও (মিরপুর জোন) মোস্তাক সরকার, উত্তরা ট্রাফিক জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. রুহুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)সহ সরকারি, বেসরকারি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিগণ, প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।


