
বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করতে এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্পনগরী স্থানান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও সেখানে মেলেনি কাঙ্খিত পরিবেশগত সুবিধা। উল্টো সাভারেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত না হওয়ায় একের পর এক বৈশ্বিক ক্রেতা হারাচ্ছে বাংলাদেশ। এর ফলে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন দেশীয় ফিনিশড লেদার রপ্তানিকারক থেকে শুরু করে তৃণমূলের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।
শনিবার (৬ জুন) পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘আজকের এজেন্ডা’ ধারাবাহিক আলোচনার অংশ হিসেবে ‘বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ কি ফিকে হয়ে আসছে?’ শীর্ষক একটি নীতি-সংলাপে অংশীজন ও বিশেষজ্ঞরা এসব ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সংলাপে সাভার চামড়াশিল্প নগরীর অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মো. টিপু সুলতান। তিনি বলেন, রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের মূল কারণ ছিল পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু আজও আমরা সেই সুবিধা পাইনি। এর ফলে আমরা ক্রেতা হারিয়েছি। আমাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ছোট শিল্পও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এতে ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎপাদন সম্প্রসারণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার দূরদর্শিতার অভাবকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান। এ বিষয়ে তিনি বলেন, হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের উদ্দেশ্য ছিল বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত করা, কিন্তু দূষণের প্রভাব আজও বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী—উভয় নদীতেই বিদ্যমান। আমাদের একমাত্রিক সৎ উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত সব সময় ভালো ফল বয়ে আনবে—এমনটি নাও হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, পরিবেশ, অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে জেনি শুজ-এর চেয়ারম্যান নাসির খান দেশের জটিল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, কর-সংক্রান্ত হয়রানি এবং অকার্যকর প্রণোদনা কাঠামোর সমালোচনা করেন। ত্রুটিপূর্ণ কর নীতির কারণে ইউনিকলোর মতো বড় প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে প্রয়োজনীয় ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বাংলাদেশ এখনো গড়ে তুলতে পারেনি।
অন্যদিকে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, একসময় চামড়াশিল্পকে ঘিরে যে সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম)-এর মতো নতুন পরিবেশগত মান পূরণে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান।
এছাড়া, দেশীয় মূল্যশৃঙ্খলে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া নষ্ট হচ্ছে বলে জানান কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এম. এ. সাত্তার মন্ডল। এ সময় চামড়ার অপচয় রোধে কোরবানির পশু জবাইয়ের পরপরই দ্রুত লবণ প্রয়োগ এবং সরকারি সহায়তার ওপর জোর দেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়াশিল্পের গতি পুনরুদ্ধার এবং বৈশ্বিক বাজারে কার্যকর অবস্থান নিশ্চিত করতে কেবল স্থানান্তরের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং পরিবেশ, অর্থনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিয়ে একটি বহুমাত্রিক ও সমন্বিত জাতীয় মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানে আলোচনার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ সংকট নিয়ে নিজ নিজ মতামত তুলে ধরেন ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন এবং ব্যবসায়ী ও চামড়া খাত সংশ্লিষ্ট অংশীজন মোছাদ্দেকুল হক প্রমুখ।