ঢাকারবিবার , ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য

টিকাদানের ঘাটতি ও স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতায় দেশে হামের প্রাদুর্ভাব

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:১৭ বিকাল

Link Copied!

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদানে নানা ধরনের ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি এক ভয়াবহ ও সংকটাপন্ন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত টিকাদানে বিভিন্ন ধরনের ঘাটতি, প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা এবং টিকাপ্রাপ্তিতে তৈরি হওয়া ব্যবধানের কারণে হামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকট কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক শক্তিশালী সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

টিকাদানের ঘাটতি ও আত্মতুষ্টির খেসারত :
একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় টিকাদান কার্যক্রমে সাফল্যের জন্য বাংলাদেশের যথেষ্ট সুনাম ছিল। কিন্তু সফলতার ধারাবাহিকতায় একধরনের আত্মতুষ্টি তৈরি হওয়ায় রুটিন টিকাদানের সুরক্ষাবলয় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের নির্দেশনা অনুযায়ী, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করতে হলে জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ যৌথ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের টিকাদানের হার সেই কাঙ্খিত লক্ষ্যের অনেক নিচে নেমে যায়। মহামারীকালীন সৃষ্ট বিঘ্ন এবং পরবর্তী সময়ে টিকাদান কার্যক্রমে ধারাবাহিক নজরদারির অভাবে শিশুদের একটি বড় অংশ জীবনরক্ষাকারী এই টিকার আওতা থেকে ছিটকে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা প্রদানে ফাঁকফোকরের কারণেই বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ বিষয়ে মহামারি বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘টিকা প্রদানে ফাঁকফোকরের কারণেই বাংলাদেশ তার হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমার জানামতে, বাংলাদেশ এর আগে কখনো এত শিশুকে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে দেখেনি। এমনকি এক বছরে এত বেশি রোগীও এর আগে দেখা যায়নি। এটি সত্যিই একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি, আর সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো এর শিকার হচ্ছে শিশুরা।’

ঢাকা শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আতিকুল ইসলাম যোগ করেন, ‘আমাদের হার্ড ইমিউনিটি একসময় ৯৫ শতাংশ ছিল, কিন্তু গত দুই থেকে তিন বছরে তা কমে গেছে। এই হ্রাসের কারণেই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেক বেশি শিশুকে সুরক্ষাহীন করে তুলেছে।’

স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোগত দুর্বলতা ও লজিস্টিক সংকট :
দেশের স্বাস্থ্য খাতের ভেতরের এই সংকটটি মূলত প্রান্তিক ও জনবহুল জনপদের শিশুদের অরক্ষিত করে তুলেছে। বস্তি এলাকা, দুর্গম জনপদ কিংবা ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলোর কাছে নিয়মিত টিকাদান সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও লজিস্টিক ঘাটতি প্রকট হয়ে ওঠে। টিকার উপযুক্ত তাপমাত্রা বজায় রাখার সমস্যা, মাঠপর্যায়ে জনবলের ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অরক্ষিত শিশুদের শরীরে অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে হামের ভাইরাস।

স্বাস্থ্য যোগাযোগ গবেষক আবু মোহাম্মদ শাকিল ফয়জুল্লাহর মতে, হাম হলো সুশাসনের একটি পরীক্ষা। এটি দেখায় যে একটি রাষ্ট্র প্রতি সপ্তাহে, প্রতিটি জেলায় এবং প্রতিটি শিশুর জন্য নিয়মিত সেবা বজায় রাখতে পারে কিনা। যখন সংগ্রহে বিলম্ব হয়, স্টক সুরক্ষিত থাকে না, নজরদারির সতর্কবার্তায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয় না এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে স্পষ্ট যোগাযোগ থাকে না, তখন ভাইরাসটি সেই ফাঁকফোকরগুলো খুঁজে নেয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রথম শিক্ষা হলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে রক্ষা করতে হবে। সরকার বদলাতে পারে, মন্ত্রী বদলাতে পারে, সংগ্রহের নিয়ম বদলাতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো যখন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক করবে তখন শিশু টিকাদান বন্ধ রাখা যাবে না।

মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও বেশি শোচনীয়। গ্রামীণ অঞ্চলের স্বাস্থ্যকর্মী নাজমূল ইসলাম জানান, হামের টিকা বেশ সংবেদনশীল। অতিরিক্ত গরমে এর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। হামের টিকা ২ ডিগ্রি থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সংরক্ষণ করতে হবে, কিন্তু যখন আমরা কাজ করি, তখন পারিপার্শ্বিক পরিবেশের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রিরও বেশি থাকে। এখানে কোনো স্থায়ী টিকাকেন্দ্রে টিকাদানের ব্যবস্থা নেই; আমাদের গাছের নিচে, মানুষের উঠানে বা মাদ্রাসার বারান্দায় শিশুদের টিকা দিতে হয়। প্রকৃতপক্ষে এখানে একটি যথাযথ ইপিআই কেন্দ্র প্রয়োজন।

হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ এবং অসহায়ত্বের চিত্রও হৃদয়বিদারক। ঢাকায় শিশু হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক রোগীর মা শর্মিন আক্তার বলেন, ‘আমি এই ওয়ার্ডে একটি শিশুকে মারা যেতে দেখেছি, তাই আমি খুব ভয় পাচ্ছি। এখানে থাকা সব শিশুরই হাম হয়েছে।’

বিশ্বজুড়ে কড়া বার্তা :
সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের এই স্বাস্থ্য বিপর্যয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ যেসব দেশ নিজেদের বহু আগে হাম নির্মূল বা ‘মিজলস এলিমিনেশন’ ঘোষণা করেছিল, সেখানেও টিকাদানের হার হ্রাসের কারণে নতুন করে প্রাদুর্ভাব মাথাচাড়া দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন কিংবা যেকোনো ধরনের উন্নয়নের পরও যদি নিয়মিত টিকাদানের সুরক্ষাবলয় শিথিল করা হয়, তবে যেকোনো উন্নত দেশও এমন ভয়াবহ মহামারীর মুখে পড়তে পারে।

সংকট উত্তরণে করণীয় :
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল জরুরি বা সাময়িক টিকাদান ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এর জন্য প্রয়োজন— রুটিন টিকাদান ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত ও আরও বেশি গতিশীল করা। দুর্গম ও প্রান্তিক অঞ্চলে প্রতিটি শিশুর কাছে টিকার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। কোল্ড চেইন এবং আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে বজায় রাখা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে টিকাসংক্রান্ত যেকোনো ধরনের ভীতি বা বিভ্রান্তি দূর করা।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

upay and SplitPay Sign Strategic Partnership to Make University Semester Fee Payments More Flexible

উপায় এবং স্প্লিটপে-এর কৌশলগত অংশীদারিত্ব: বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফি পরিশোধ হবে আরও সহজ

From Pixels to Perspectives: OPPO & BUP Join Hands to Spotlight Young Visual Storytellers

তরুণদের সৃজনশীলতার নতুন মঞ্চ ‘স্ফূরণ ৬.০’, থাকছে নানা সুযোগ

এসডিজি বাস্তবায়নে গতি বাড়িয়ে দারিদ্র্য ও বৈষম্য অবসানে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার দাবি

Lifebuoy Friendship Hospital has provided healthcare services to over 800,000 patients in remote riverine island areas

দুর্গম চরাঞ্চলে ৮ লাখের বেশি রোগীকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছে লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল

চট্টগ্রামের বাজারে নতুন ফল ‘সাম্মাম’, কেজি ১০০-১৫০ টাকা

টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ার আহ্বান

পটুয়াখালীতে বাস-অটোরিকশা সংঘর্ষ, খাদে পড়ে নিহত ৪

ভোরেই ঢাকায় তুমুল বৃষ্টি, সঙ্গে বজ্রপাত

ভোরের মুষলধারে বৃষ্টিতে ডিএসসিসির কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা