
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রজাপতিরা তাদের বাসস্থান বদলাচ্ছে। নতুন এক বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক প্রজাতি তাদের ভৌগোলিক বিস্তার বাড়াচ্ছে বা কমাচ্ছে, আবার অনেক প্রজাতি উচ্চতাও পরিবর্তন করছে। গবেষকদের মতে, এটি শুধু প্রজাপতির পরিবর্তন নয়, বরং পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
প্রজাপতিকে দীর্ঘদিন ধরেই “পরিবর্তনের প্রহরী” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পরিবেশ বদলে যাওয়ায় তারা টিকে থাকার জন্য নিজেদের বাসস্থান পরিবর্তন করছে। বিশ্বের যেসব মহাদেশে প্রজাপতি রয়েছে, প্রায় সবখানেই এই পরিবর্তনের চিত্র দেখা যাচ্ছে।
‘নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’ জার্নালে প্রকাশিত বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০টি প্রজাতির মধ্যে প্রায় একটি প্রজাতি ইতোমধ্যেই তাদের ভৌগোলিক বিস্তার বাড়িয়েছে বা কমিয়েছে, অথবা উচ্চতা পরিবর্তন করেছে।
গবেষণাটির প্রধান লেখক এবং মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল চেঞ্জ ইকোলজি ল্যাবের প্রধান ড. শাওয়ান চৌধুরী বলেন, ১০৫টি দেশের ১ হাজার ৭৫৮টি প্রজাতির স্থান পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে করা এই গবেষণায় পরিবর্তনের “বিস্ময়কর” মাত্রা উঠে এসেছে। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়াই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ।
ড. চৌধুরী বলেন, “প্রজাপতিরা আগাম সতর্কবার্তার সূচক এবং তারা সমগ্র গ্রহ জুড়ে একটি সতর্কবার্তা দিচ্ছে। যদি তাদের বিচরণক্ষেত্র এত নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়, তবে তা বাস্তুতন্ত্র জুড়ে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।”
গবেষণায় দেখা গেছে, স্থান পরিবর্তন করা প্রায় ৮০ শতাংশ প্রজাপতি তাদের বিচরণক্ষেত্র সম্প্রসারণ করেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তারা নতুন উপযোগী এলাকায় চলে যাচ্ছে।
ড. চৌধুরী বলেন, কিছু প্রজাতি আশ্চর্যজনকভাবে দ্রুত স্থানান্তরিত হয়েছে। এর মধ্যে টনি কস্টার প্রজাপতি, যা মূলত ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার স্থানীয় প্রজাতি, ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করে। এরপর থেকে এটি প্রতি বছর গড়ে ১৩৫ কিলোমিটার হারে স্থানান্তরিত হয়েছে। তবে তিনি বলেন, বিচরণক্ষেত্রের সম্প্রসারণ সব সময় ইতিবাচক নয়। কারণ কোনো প্রজাতি যদি কম উপযোগী আবাসস্থলে চলে যায়, তাহলে তাদের সংখ্যা কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে, প্রায় ২৭ শতাংশ প্রজাতির বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ছোট প্রজাপতি কুপিডো মিনিমাসও রয়েছে। এসব প্রজাতি তাদের আগের অনেক এলাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। আবার কিছু প্রজাতি উঁচু বা নিচু এলাকায় স্থানান্তরিত হয়ে উচ্চতাও পরিবর্তন করেছে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, সব মহাদেশেই, বিশেষ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে প্রজাপতির বিচরণক্ষেত্র সম্প্রসারণের প্রবণতা দেখা গেছে। অন্যদিকে বিচরণক্ষেত্র সংকোচন প্রধানত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ঘটেছে। উচ্চতার পরিবর্তন প্রায় একচেটিয়াভাবে উত্তর গোলার্ধে দেখা গেছে।
গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়াই এসব পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। তবে আবাসস্থল ধ্বংস এবং কৃষির মতো অন্যান্য কারণও এতে ভূমিকা রেখেছে।
জার্মানিতে জলাভূমি নিষ্কাশনের কারণে ক্র্যানবেরি ফ্রিটিলারি (Boloria aquilonaris) প্রজাতিটি তার মূল আবাসস্থলের বেশিরভাগই হারিয়েছে। রোমানিয়ায় কৃষিকাজের নিবিড়করণের ফলে দানিউব ক্লাউডেড ইয়েলো বাটারফ্লাই (Colias myrmidone)-এর বিস্তার সংকুচিত হয়েছে। অন্যদিকে ব্রাজিলে জলবায়ু উষ্ণায়নের প্রতিক্রিয়ায় গোডার্টিয়ানা বাইসেস (Godartiana byses) নামের নীল প্রজাপতিটি রিও ডি জেনিরো ও বাহিয়া রাজ্য থেকে সাও পাওলো পর্যন্ত তার বিস্তার বাড়িয়েছে।
ড. চৌধুরী বলেন, কিছু প্রজাতির বিস্তারের এক অংশে সম্প্রসারণ এবং অন্য অংশে সংকোচন ঘটছে, যা “বেশ উদ্বেগজনক”। তিনি বলেন, “আপনি সত্যিই জানেন না যে সেই প্রজাতিটির ক্ষেত্রে কী ঘটতে চলেছে। দীর্ঘমেয়াদে তারা বিপন্ন হবে, নাকি ন্যূনতম উদ্বেগের মধ্যে থাকবে।”
তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রজাতির স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রজাপতি সংরক্ষণ পরিকল্পনাও পরিবর্তন করতে হবে।
তিনি বলেন, “প্রজাতিরা কী করছে, তারা কোথায় যাচ্ছে এবং আমরা কীভাবে তাদের রক্ষা করতে পারি, তা বোঝার জন্য আমাদের জরুরিভাবে সমন্বিত বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন, বিশেষ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে।”
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে বিপন্ন এলথাম কপার বাটারফ্লাই পুনরুদ্ধারের আশাব্যঞ্জক লক্ষণ দেখা গেছে। ১৯৮৬ সালে পুনরায় আবিষ্কারের আগে ছোট, উজ্জ্বল এবং প্রায় কোটের বোতামের আকারের এই প্রজাপতিটিকে বিলুপ্ত বলে মনে করা হতো।
এই প্রজাতির টিকে থাকা নির্ভর করে সুইট বার্সারিয়া নামে একটি স্থানীয় গুল্ম এবং ওই গাছের শিকড়ে বসবাসকারী নটনকাস পিঁপড়ার সঙ্গে জটিল ত্রিমুখী সম্পর্কের ওপর।
স্থানীয় সংগঠন ফ্রেন্ডস অব দ্য এলথাম কপার বাটারফ্লাই, নিলুম্বিক শায়ার এবং পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইয়ারা ভ্যালি ওয়াটার-এর দীর্ঘদিনের বৃক্ষরোপণ ও আবাসস্থল পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের ফলে পরিবেশগত সমীক্ষায় স্থানীয় গাছপালায় এই প্রজাপতির লার্ভার সংখ্যা প্রায় পাঁচগুণ বেড়েছে।
ইয়ারা ভ্যালি ওয়াটারের জীববৈচিত্র্য কর্মকর্তা ক্রিস ফ্যারো, যিনি এই বৈশ্বিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, বলেন, এলথাম কপার বাটারফ্লাই “ফিরে আসছে”। তার মতে, এর প্রধান কারণ ওই এলাকার প্রতিবেশী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ।
তথ্যসুত্র: দ্য গার্ডিয়ান