
মানুষের কর্মকাণ্ডে দ্রুত বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর পরিবেশ। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, দূষণ, আবাসস্থল ধ্বংস এবং অতিরিক্ত শিকারের মতো নানা চাপের মুখে টিকে থাকতে প্রাণীদের একটি অংশও দ্রুত নিজেদের আচরণ, শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও জীবনযাপনের ধরন বদলে নিচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই এসব পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘সমসাময়িক বিবর্তন’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
গবেষকদের মতে, মানুষ এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিবর্তনীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শহর ও শিল্পাঞ্চলের বিস্তার যেমন প্রাণীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তেমনি কিছু প্রজাতির জন্য তৈরি করছে নতুন সুযোগও।

পুয়ের্তো রিকোর অ্যানোল টিকটিকি এর একটি উদাহরণ। শহরে বসবাসকারী এসব টিকটিকি বনাঞ্চলে থাকা একই প্রজাতির তুলনায় শারীরিকভাবে কিছুটা আলাদা হয়ে উঠছে। দালান, কাচ ও ধাতব পৃষ্ঠে চলাফেরা এবং উত্তপ্ত মাটিতে দ্রুত চলার উপযোগী করে তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ লম্বা হওয়ার পাশাপাশি পায়ের পাতার নিচের সূক্ষ্ম আঁশ বা ‘টো ল্যামেলি’ বেশি বিকশিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুধু শারীরিক পরিবর্তন নয়, নগরজীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রাণীরা আচরণেও পরিবর্তন আনছে। নতুন শিকারি শনাক্ত করা, খাবার ও আশ্রয়ের নতুন উৎস খুঁজে নেওয়া, অতিরিক্ত শব্দ ও কৃত্রিম আলোর সঙ্গে মানিয়ে চলা এবং দূষিত পরিবেশে টিকে থাকার মতো নানা কৌশল তারা আয়ত্ত করছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিস ক্যাম্পাসের গবেষক অ্যান্ড্রু সিহের মতে, পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে আচরণগতভাবে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারা প্রাণীদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে এই আচরণগত অভিযোজনই জিনগত বিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।

শহুরে পরিবেশে ব্রিটিশ লাল শিয়ালের ক্ষেত্রেও এমন অভিযোজন দেখা যায়। শহরে খাবারের সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলক কম শিকারির উপস্থিতির কারণে তাদের প্রজনন হার অনেক সময় গ্রামীণ শিয়ালের তুলনায় বেশি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের র্যাকুনের ক্ষেত্রেও মানুষের আশপাশে কম আক্রমণাত্মক হওয়ার মতো পোষ মানার প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
ডেনমার্কের শহুরে খরগোশও মানুষের উপস্থিতির প্রতি তুলনামূলক বেশি সহনশীল হয়ে উঠেছে। গবেষকদের ধারণা, এর পেছনে প্রাণীর জিনের প্রকাশের পরিবর্তন কিংবা মানুষের উপস্থিতি সহ্য করতে সক্ষম প্রাণীদের ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভূমিকা থাকতে পারে।

শুধু স্তন্যপায়ী নয়, শহরের পাখিরাও পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে। যানবাহনের শব্দের মধ্যে নিজেদের গান অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে অনেক পাখি গানের কম্পাঙ্ক, তীব্রতা ও সময় পরিবর্তন করছে।
ডার্ক-আইড জাঙ্কো পাখির মধ্যেও দ্রুত অভিযোজনের নজির পাওয়া গেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার নগর এলাকায় বসতি গড়ে তোলার পর এসব পাখির আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। তারা কম আক্রমণাত্মক হয়েছে, তুলনামূলক আগে প্রজনন শুরু করেছে, বেশি সংখ্যক বাচ্চা লালন-পালন করেছে এবং পরিযায়ী আচরণেও পরিবর্তন এনেছে। শহুরে পরিবেশে তাদের ডানাও তুলনামূলক ছোট হয়েছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে, যা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় চলাচলের সঙ্গে অভিযোজনের ফল হতে পারে।
মানুষের সরাসরি প্রভাবেও প্রাণীর বিবর্তন ঘটছে। আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে দাঁতসহ হাতির সংখ্যা কমে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে চোরাশিকারকে ধরা হচ্ছে। দাঁতওয়ালা হাতি শিকারিদের বেশি টার্গেট হওয়ায় দাঁতহীন হাতিরা তুলনামূলক বেশি বেঁচে যাচ্ছে এবং তাদের এই বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে।

একইভাবে, অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে কিছু মাছের আকার ছোট হয়ে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা গেছে। বড় মাছগুলো বেশি ধরা পড়ায় ছোট মাছের বেঁচে থাকা ও প্রজননের সুযোগ বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ছোট আকারের বৈশিষ্ট্যটি ওই জনগোষ্ঠীতে বেশি দেখা দিতে পারে।
দূষিত পরিবেশেও কিছু প্রাণী দ্রুত অভিযোজিত হচ্ছে। আটলান্টিক কিলফিশের ক্ষেত্রে বিষাক্ত পদার্থ ও শিল্প রাসায়নিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোজন মূলত রাসায়নিকের প্রতি প্রাণীর শরীরের প্রতিক্রিয়ায় জড়িত জৈব-রাসায়নিক পথের জিনগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে সব প্রাণীর পক্ষে এই দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো সম্ভব হচ্ছে না। গবেষকদের মতে, পরিবেশ পরিবর্তনের গতি অনেক ক্ষেত্রে এত বেশি যে কোনো কোনো প্রজাতির বিবর্তিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময়ই পাওয়া যাচ্ছে না।
অ্যান্ড্রু সিহ বলেন, একই প্রজাতির কিছু প্রাণী নতুন পরিবেশের সঙ্গে আচরণগতভাবে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারে, আবার অন্যরা তা পারে না। ফলে যারা দ্রুত অভিযোজিত হতে পারে, তাদের টিকে থাকা ও প্রজননের সুযোগ বাড়ে; অন্যদিকে দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা প্রাণীরা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে।
গবেষকদের মতে, আগামী দশকগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও দূষণের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। ফলে পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে সক্ষম প্রাণীদের মধ্যেও নতুন নতুন অভিযোজন দেখা যেতে পারে। তবে পরিবর্তনের গতি যদি প্রাণীদের অভিযোজন ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে অনেক প্রজাতির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।