ঢাকাশুক্রবার , ২১ নভেম্বর ২০২৫
  • অন্যান্য

গণতন্ত্রের সংকট গভীর হচ্ছে, “বাস্তবতা ভেঙে পড়ছে”: জিআইজেসিতে মারিয়া রেসার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
নভেম্বর ২১, ২০২৫ ৬:৫৮ অপরাহ্ণ । ১৭৫ জন

বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের জন্য “বাস্তবতার ভাঙন” ও তথ্য-অস্ত্রায়নকে দায়ী করে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন নোবেলজয়ী সাংবাদিক ও র‍্যাপলার সিইও মারিয়া রেসা। মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে (GIJC) তিনি বলেন, মিথ্যা তথ্য, ডিপফেক ও নজরদারি–নির্ভর প্রযুক্তি মানুষের সত্যে বিশ্বাসকে দ্রুত ক্ষয় করছে।

রেসা বলেন, “তথ্য ছাড়া সাংবাদিক থাকবে না; আর সাংবাদিক ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না।” তিনি সুইডেনের ভি–ডেম ইনস্টিটিউটের তথ্য তুলে বলেন, বর্তমানে বিশ্বের ৭২ শতাংশ মানুষ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে, যার বড় অংশই ডিজিটাল বিভ্রান্তিকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

ডিপফেকের বড় লক্ষ্য হচ্ছে সাংবাদিকরা

সভায় রেসা নিজের কণ্ঠ নকল করে বানানো একটি ডিপফেক অডিও শোনান, যেখানে তাকে ভুয়া ক্রিপ্টো স্কিম প্রচার করতে শোনা যায়। তিনি জানান, “আমার নামে এমনকি ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন ফেলে দিতে বলেছে-এমন ডিপফেকও ছড়ানো হয়েছে।”

তার মতে, নারী, LGBTQ+ কমিউনিটি এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এ আক্রমণের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।

“নীতিনির্ধারণ নয়, এখন বর্ণনার যুদ্ধ রাজনীতি চালাচ্ছে”

রেসা জানান, র‍্যাপলারের ডেটা ইউনিট ‘নার্ভ’ ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে-নির্বাহী আদেশ, রাজনৈতিক ইস্যু বা সংকটকে কেন্দ্র করে একটি বর্ণনা তৈরির পর সেটিকে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

তার ভাষায়, “এভাবেই যৌথ বাস্তবতা ভেঙে পড়ে, আর মিথ্যা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বৈধতার উৎস।”

দুতের্তে সরকারের চাপে র‍্যাপলারের পতন ও পুনরুদ্ধার

রেসা জানান, ২০১৬ সালে ফিলিপাইনে দুতের্তে সরকারের টার্গেটে পড়ার পর মাত্র চার মাসে র‍্যাপলারের বিজ্ঞাপন আয় ৪৯ শতাংশ কমে যায়। টিকে থাকার জন্য তারা অ-সাংবাদিক বিভাগকে আলাদা করে তৈরি করে নতুন কোম্পানি ‘নার্ভ’, যা এখন তথ্য-ফরেনসিক, বর্ণনা বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল আক্রমণের মানচিত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়—ভুয়া তথ্য ছড়ানোর একই প্যাটার্ন বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান: মিথ্যা বর্ণনা বপন → তা লালন→ অ্যালগরিদমে বাড়ানো → সংকটে সুযোগ নেওয়া → মিথ্যাকে স্বাভাবিক করা।

পরিস্থিতি বদলানোর তিন সমাধান

রেসা গণতন্ত্র রক্ষায় তিনটি পদক্ষেপের ওপর জোর দেন:

১. নজরদারি–নির্ভর ব্যবসায়িক মডেল বন্ধ করা—ব্যক্তিগত তথ্যকে পণ্য হিসেবে বিক্রির প্রথা থামাতে হবে।

২. সাংবাদিকদের ‘র‍্যাডিক্যাল সহযোগিতা’—ফিলিপাইনে তার নেতৃত্বে ১৫০ সংগঠন নিয়ে গঠিত “Facts First PH” প্রতিদিন যৌথভাবে ফ্যাক্ট-চেক করে বিভ্রান্তি মোকাবিলা করেছে।

৩. জনস্বার্থে নিরাপদ প্রযুক্তি তৈরি—তিনি জানান, র‍্যাপলার ও অংশীদাররা Matrix প্রোটোকল–ভিত্তিক নিরাপদ যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা ইতোমধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ব্যবহার করছে।

“তথ্যের সততা-সব লড়াইয়ের মা”

সাংবাদিকদের উদ্দেশে রেসার শেষ প্রশ্ন— “সত্য রক্ষায় আপনি কী ত্যাগ করতে প্রস্তুত?”

তিনি বলেন, “এটি বৈশ্বিক যুদ্ধ। একা কেউ জিতবে না। র‍্যাডিক্যাল সহযোগিতা ও র‍্যাডিক্যাল সৃজনশীলতাই আমাদের পথ।”