ঢাকামঙ্গলবার , ৩ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

একজন মা মানেই পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নির্মাতা

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১০ মে ২০২৬, ১০:৫৭ সকাল

Link Copied!

মা-একটি ছোট শব্দ, অথচ এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, ভালোবাসা ও ত্যাগের গল্প। সন্তান জন্ম দেওয়া থেকে শুরু করে তার বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ, পরিবারের ভারসাম্য রক্ষা-সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন একজন মা। অথচ এই নিরবচ্ছিন্ন শ্রমের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই ছুটি, নেই অবসর কিংবা বেতন।

আজ বিশ্ব মা দিবসে আবারও সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-“মাতৃত্ব কি শুধুই দায়িত্ব, নাকি এটি একটি পূর্ণকালীন চাকরি?” সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও মানবাধিকারকর্মীদের বড় একটি অংশ মনে করেন, মাতৃত্ব শুধু আবেগ বা পারিবারিক ভূমিকা নয়; এটি এমন এক শ্রম, যা রাষ্ট্র ও সমাজের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখে।

মাতৃত্ব: অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য শ্রম

একজন মা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিবারের জন্য অসংখ্য কাজ করেন। সন্তানকে খাওয়ানো, স্কুলে পাঠানো, অসুস্থতার সময় সেবা দেওয়া, রান্না, ঘর গোছানো, পরিবারের মানসিক স্থিতি বজায় রাখা-সবকিছুই মূলত অবৈতনিক শ্রম।

বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি “অবৈতনিক পরিচর্যা কাজ” করেন। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নারীদের এই শ্রমকে এখনো “স্বাভাবিক দায়িত্ব” হিসেবে দেখা হয়, পেশা হিসেবে নয়।

বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যায়। শহর কিংবা গ্রাম-উভয় জায়গাতেই অসংখ্য নারী পরিবার ও সন্তানের জন্য সারাদিন কাজ করলেও তাদের “কাজ না করা মানুষ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অথচ অর্থনীতিবিদদের মতে, গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজের আর্থিক মূল্য হিসাব করা হলে জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান বিপুল।

মাতৃত্বের মানসিক চাপ বাড়ছে

বর্তমান সময়ে মায়েদের দায়িত্ব আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। আধুনিক জীবনযাত্রা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, চাকরিজীবী নারীদের দ্বৈত দায়িত্ব, সন্তানের শিক্ষার চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা-সব মিলিয়ে অনেক মা শারীরিক ও মানসিক চাপে ভুগছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে “পারফেক্ট মা” হওয়ার সামাজিক চাপ নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের জীবন দেখে নিজেদের তুলনা করার প্রবণতাও বাড়ছে। ফলে অনেক মা আত্মগ্লানি, উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত হচ্ছেন।

অনেক কর্মজীবী মা আবার অফিস ও পরিবারের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে চরম ক্লান্তির মধ্যে পড়েন। অফিস শেষে ঘরে ফিরে আবার সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে তাদের জন্য আলাদা বিশ্রাম বা ব্যক্তিগত সময় খুবই সীমিত হয়ে পড়ে।

কর্মজীবী মায়েদের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও মাতৃত্ববান্ধব পরিবেশ এখনো পর্যাপ্ত নয়। অনেক কর্মজীবী মা মাতৃত্বকালীন ছুটি, ডে-কেয়ার সুবিধা কিংবা নমনীয় কর্মঘণ্টা থেকে বঞ্চিত হন।

বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন সুবিধা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক নারী গর্ভধারণের পর চাকরি হারানোর ভয়েও থাকেন। আবার সন্তান জন্মের পর কর্মজীবনে ফিরে আসতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন।

গ্রামীণ অঞ্চলের নারীদের অবস্থা আরও কঠিন। কৃষিকাজ, গৃহস্থালি কাজ ও সন্তান পালন-সব দায়িত্ব একসঙ্গে বহন করতে হয় তাদের। কিন্তু এসব শ্রমের খুব কম অংশই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়।

প্রযুক্তির যুগেও কমেনি মায়ের দায়িত্ব

প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রপাতি গৃহস্থালি কাজ সহজ করেছে-এমন ধারণা থাকলেও বাস্তবে মায়েদের দায়িত্ব খুব একটা কমেনি। বরং এখন সন্তানদের ডিজিটাল নিরাপত্তা, অনলাইন শিক্ষা, মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়েও মায়েদের বাড়তি নজর রাখতে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে মায়েদের শুধু সন্তান লালন-পালন নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে সন্তানকে মানসিকভাবে সুস্থ ও সামাজিকভাবে সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জও নিতে হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অনেক গবেষণায় বলা হয়েছে, একজন মায়ের প্রতিদিনের কাজের জন্য যদি বেতন নির্ধারণ করা হয়, তাহলে তা অনেক পেশাজীবীর মাসিক আয়ের সমান বা তার চেয়েও বেশি হতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, মাতৃত্ব ও গৃহস্থালি শ্রমের মূল্য স্বীকৃতি না পাওয়ায় জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে। যদিও এই শ্রম ছাড়া পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ত।

প্রয়োজন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মা দিবসে শুভেচ্ছা জানানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মায়েদের শ্রম ও ত্যাগের বাস্তব স্বীকৃতি।

এর জন্য প্রয়োজন- মাতৃত্ববান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সুবিধা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা জোরদার করা, গৃহস্থালি শ্রমের সামাজিক স্বীকৃতি বৃদ্ধি, পরিবারের দায়িত্ব নারী-পুরুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া, মাতৃত্বকালীন সুবিধা বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, “মায়ের কাজ শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া নয়; একজন মানুষ, একটি পরিবার, এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্বও তিনি পালন করেন।”

মা দিবসের বার্তা

বিশ্ব মা দিবস শুধু উদযাপনের দিন নয়; এটি মায়েদের অবদান, ত্যাগ ও অদৃশ্য শ্রমকে নতুনভাবে মূল্যায়নেরও একটি উপলক্ষ।

একজন মা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কর্মী নন। তার দায়িত্ব ২৪ ঘণ্টার, বছরের প্রতিটি দিনের। তিনি অসুস্থ হলেও ছুটি নেন না, ক্লান্ত হলেও দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান না।

তাই মাতৃত্বকে শুধুমাত্র আবেগের জায়গা থেকে নয়, সমাজ ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রম হিসেবেও দেখার সময় এসেছে। কারণ একজন মায়ের হাত ধরেই গড়ে ওঠে পরিবার, সমাজ ও আগামী পৃথিবী।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

স্ন্যাপড্রাগন ফাইভজি প্রসেসরসহ রেডমি ১৭ ফাইভজি উন্মোচন করল শাওমি

আগামী গ্রীষ্মের আগে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে: প্রধানমন্ত্রী

পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়তে সব প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দুই বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা

নেপালে অবতরণের সময় দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ, নিহত ১

বুয়েটের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হলেই মিলবে ই-রিকশার নিবন্ধন

সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হলে ডিলারশিপ বাতিল: কৃষিমন্ত্রী

গ্যাস সংকটের মধ্যে নোয়াখালীতে নতুন গ্যাসের সন্ধান

এক দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি

হিমালয়ে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা, ঝুঁকির মুখে প্রায় ৩ লাখ মানুষ

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জরুরি প্রস্তুতি, কীসের আশঙ্কায় খাবার-পানি মজুতের পরামর্শ?

ঢাকায় মেঘলা আকাশ, আবহাওয়া থাকবে শুষ্ক