
ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচসহ তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের নতুন হুমকি মোকাবিলায় আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল (এনটিসিসি)-এর মহাপরিচালক মো. আখতারুজ্জামান (যুগ্মসচিব)। একই সঙ্গে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে নতুন করে যুক্ত হওয়া বিধানগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে গবেষকদের সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রাজধানীর বিএমএ ভবনে ‘বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষণার ভবিষ্যৎ প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক পরামর্শক সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও তামাক নিয়ন্ত্রণে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ নিয়ে দেশে আগে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। ফলে এসব নতুন পণ্যের বিষয়ে নীতিনির্ধারণে প্রয়োজনীয় দেশীয় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচকে তামাক নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও গবেষণাভিত্তিক তথ্য না থাকায় কিছু ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো রিসার্চ নেই-না সরকারি পর্যায়ে, না বেসরকারি পর্যায়ে।’ এ কারণে ই-সিগারেটসহ নতুন নিকোটিনজাত পণ্যের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য ও রেফারেন্সের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এনটিসিসি মহাপরিচালক গবেষণায় নতুন ও সম্ভাব্য হুমকিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিশেষ করে নিকোটিন পাউচের মতো নতুন পণ্যগুলো এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। এসব পণ্যের ব্যবহার, স্বাস্থ্যঝুঁকি, বাজার বিস্তার এবং তরুণদের ওপর প্রভাব নিয়ে দেশে গবেষণা প্রয়োজন।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, আগে গণপরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে মূলত সিগারেট ব্যবহারকারীদের বিরোধিতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে জর্দাসহ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারীরাও আইনের আওতায় আসায় নতুন ধরনের সামাজিক ও বাস্তবায়নগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, একই গণপরিবহনে একজন সিগারেট খেলে যেমন অন্য যাত্রীরা তার বিরোধিতা করেন, তেমনি জর্দা ব্যবহারকারীরা নিজেদের তামাক গ্রহণকে অনেক সময় ক্ষতিকর হিসেবে দেখেন না। ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণে তাদের সম্পৃক্ত করে আইন বাস্তবায়নের পক্ষে আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
গণপরিবহনে ধূমপান বন্ধের অগ্রগতি তুলে ধরে আখতারুজ্জামান বলেন, গবেষণায় এখনো বাসে ধূমপানের ঘটনা উঠে আসছে। তবে বাস্তবে এসব ঘটনার বড় অংশের সঙ্গে চালক ও সহকারীরা জড়িত। মাত্র দুজনের কারণে পুরো পরিবহন খাত বা ৪০ জন যাত্রীকে দায়ী করা যৌক্তিক নয়। তাই চালক ও সহকারীদের ধূমপান বন্ধে বিকল্প ব্যবস্থা ও সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রয়োজন।
আইন প্রয়োগের ঘাটতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। আখতারুজ্জামান বলেন, মাঠপর্যায়ে আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এনটিসিসির অধীনে কাজ না করায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য তাদের অনুরোধ করতে হয়।
মো. আখতারুজ্জামান আরও বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করার সুযোগ এখন আগের তুলনায় উন্মুক্ত করা হয়েছে। অথচ এনজিওসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে বারবার মামলা করার আহ্বান জানানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে মামলা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের পক্ষেও প্রতিটি ধূমপানের ঘটনার বিরুদ্ধে মামলা করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকেও আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গবেষকদের উদ্দেশে এনটিসিসি মহাপরিচালক বলেন, নতুন আইনি সংযোজনগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে কী ধরনের কৌশল প্রয়োজন, গবেষণার মাধ্যমে তা তুলে ধরতে হবে। আইনের প্রয়োগের ঘাটতি কোথায় রয়েছে, সেটিও গবেষণায় চিহ্নিত করার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে তামাক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইতোমধ্যে যেসব গবেষণা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে যেন অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিদ্যমান গবেষণা ও তথ্যের সমন্বয়ের পাশাপাশি নতুন ও অনাবিষ্কৃত ক্ষেত্রগুলোকে গবেষণার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ব স্বাস্থ্য অনুবিভাগ) শেখ মোমেনা মনি। বিশেষ অতিথি ছিলেন এনটিসিসির মহাপরিচালক মো. আখতারুজ্জামান (যুগ্মসচিব ), বিএমইউর পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম. আতিকুল হকসহ জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিসিসিপির পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ শাহজাহান এবং সঞ্চালনা করেন এনটিসিসির প্রোগ্রাম অফিসার ডা. সজীব রায়।