
ধ্রুপদী স্থাপত্যকে মূলত পাঁচটি অর্ডার বা শৈলীর মাধ্যমে চেনা যায়। এগুলো হলো-টাস্কান, ডোরিক, আয়োনিক, করিন্থিয়ান ও কম্পোজিট। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান স্থাপত্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এসব শৈলী পরবর্তী সময়ে রেনেসাঁ যুগের স্থপতিদের মাধ্যমে প্রামাণ্য রূপ পায় এবং ইউরোপ ও আমেরিকার স্থাপত্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
স্থাপত্যের এসব অর্ডারের মধ্যে মূল পার্থক্য দেখা যায় স্তম্ভের আকৃতি, অনুপাত, স্তম্ভশীর্ষের নকশা ও অলংকরণে। ফলে ভবনের দিকে একটু খেয়াল করলেই অনেক ক্ষেত্রে কোন অর্ডার ব্যবহার করা হয়েছে তা শনাক্ত করা সম্ভব।
১. টাস্কান: সবচেয়ে সরল ও মজবুত

পাঁচটি অর্ডারের মধ্যে টাস্কান শৈলী সবচেয়ে সরল। এর স্তম্ভ সাধারণত খাঁজবিহীন এবং অলংকরণও তুলনামূলকভাবে কম। রোমানরা এটিকে ডোরিক শৈলীর সরলীকৃত রূপ হিসেবে বিবেচনা করত। এর নাম এসেছে এট্রুস্কানদের কাছ থেকে।
মজবুত ও সরল হওয়ায় সামরিক স্থাপনা, দুর্গ, আস্তাবল ও সাধারণ ভিলায় এ শৈলী ব্যবহৃত হতো। রোমের কলোসিয়ামের নিচতলাকে টাস্কান শৈলীর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।
২. ডোরিক: বলিষ্ঠ ও ব্যবহারিক

ডোরিক হলো প্রাচীন গ্রিক স্থাপত্যের সবচেয়ে পুরোনো ও সরল শৈলীগুলোর একটি। এ শৈলীর স্তম্ভ তুলনামূলকভাবে মোটা ও শক্তিশালী। ডোরিক অর্ডারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো স্তম্ভের ওপরের অংশে ট্রাইগ্লিফ ও মেটোপের সমন্বয়ে তৈরি এন্টাব্লেচার।
গ্রিসের বিখ্যাত পার্থেনন ডোরিক স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এছাড়া রোমান ও রেনেসাঁ স্থাপত্যেও এর ব্যবহার দেখা যায়।
৩. আয়োনিক: প্যাঁচানো নকশায় আলাদা

আয়োনিক অর্ডারকে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো স্তম্ভশীর্ষের প্যাঁচানো বা স্ক্রল আকৃতির নকশা। স্তম্ভের ওপরের অংশে থাকা এই ভল্যুটই আয়োনিক শৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ শৈলী ডোরিকের তুলনায় বেশি মার্জিত ও অলংকারপূর্ণ।
এথেন্সের ইরেকথিয়ন আয়োনিক স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। রোমের পোর্তুনাসের মন্দিরেও এ শৈলীর ব্যবহার দেখা যায়।
৪. করিন্থিয়ান: পাতার অলংকরণে জাঁকজমক

করিন্থিয়ান অর্ডার সবচেয়ে বেশি পরিচিত এর অলংকৃত স্তম্ভশীর্ষের জন্য। স্তম্ভের মাথায় দুই স্তরে অ্যাকান্থাস পাতার নকশা এবং সর্পিল আকৃতির অলংকরণ থাকে। ফলে দূর থেকেও এ শৈলীর স্তম্ভ তুলনামূলকভাবে সহজে চেনা যায়।
রোমের প্যান্থিয়নের সম্মুখের করিন্থিয়ান পোর্টিকো এ শৈলীর অন্যতম পরিচিত উদাহরণ। প্রাচীন রোমে সরকারি ভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় করিন্থিয়ান অর্ডার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো।
৫. কম্পোজিট: দুই শৈলীর সমন্বয়

কম্পোজিট অর্ডারে মূলত আয়োনিক ও করিন্থিয়ান শৈলীর বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে দেখা যায়। এতে করিন্থিয়ান স্তম্ভশীর্ষের সঙ্গে আয়োনিক অর্ডারের ভল্যুট বা প্যাঁচানো নকশা যুক্ত থাকে।
রোমের টাইটাসের তোরণ কম্পোজিট অর্ডারের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিজয় ও জয়ের প্রতীক হিসেবে রোমান বিজয় তোরণগুলোতে এ শৈলীর ব্যবহার বেশি দেখা যেত।
আধুনিক স্থাপত্যেও প্রভাব রয়েছে
ধ্রুপদী স্থাপত্যের এসব অর্ডারের প্রভাব দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। আধুনিকতাবাদী স্থাপত্যে কার্যকারিতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও বর্তমানে বিভিন্ন শহরের নগর নকশা ও ভবনে ধ্রুপদী স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যের পুনরুজ্জীবন দেখা যাচ্ছে।
তাই কোনো পুরোনো বা নব্য-ধ্রুপদী ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে এর স্তম্ভের গঠন, স্তম্ভশীর্ষের নকশা ও অলংকরণ একটু খেয়াল করলেই টাস্কান, ডোরিক, আয়োনিক, করিন্থিয়ান কিংবা কম্পোজিট-কোন শৈলীর প্রভাব রয়েছে, তা অনেকটাই বোঝা সম্ভব।