
সময় যেন একটি দীর্ঘ নদী। ২১শ শতকের শুরুতে পৃথিবীর মানচিত্রে যে জনসংখ্যার ভারসাম্য আমরা দেখেছি, ২১০০ সালের শেষ প্রান্তে এসে সেটি আমূল বদলে যাবে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস বলছে, তখন পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা ১১ বিলিয়নেরও বেশি হতে পারে। এই বিপুল ভিড় শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকেও নতুনভাবে গড়ে তুলবে।
বর্তমানে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের জনবহুল তিনটি দেশ। কিন্তু আগামী শতকের শেষে এসে এ দৃশ্য পাল্টে যাবে। ভারত প্রায় দেড় বিলিয়ন মানুষ নিয়ে তখনও শীর্ষে থাকবে। এর পরেই উঠে আসবে নাইজেরিয়া, যার জনসংখ্যা হবে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন। আফ্রিকার এই দেশের উত্থান আসলে পুরো মহাদেশেরই উত্থানের প্রতীক। তৃতীয় অবস্থানে থাকবে চীন, কিন্তু একসময়কার দেড় বিলিয়ন মানুষ সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৭৭০ মিলিয়নে।
আফ্রিকা হবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান কেন্দ্র। কঙ্গো, ইথিওপিয়া, তানজানিয়া, উগান্ডা ও নাইজারের মতো দেশগুলোতে অভাবনীয় জনবিস্ফোরণ ঘটবে। এই অঞ্চলের তরুণ প্রজন্ম বিশ্বশ্রমবাজারে নতুন মাত্রা যোগ করবে, যদিও তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়া প্রবল জনসংখ্যা হ্রাসের মুখোমুখি হবে। জাপান ৭৪ মিলিয়নে নেমে আসবে, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলোর জনসংখ্যাও অর্ধেকের বেশি কমে যাবে। বয়স্ক জনগোষ্ঠী ও জন্মহার কমে যাওয়াই হবে প্রধান কারণ। এই পরিস্থিতি সামলাতে উন্নত প্রযুক্তি, অভিবাসন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ঝুঁকতে হবে তাদের।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থাকবে মাঝামাঝি। জনসংখ্যা কিছুটা বাড়লেও (প্রায় ৩৯৪ মিলিয়ন) আফ্রিকা ও এশিয়ার তুলনায় বৃদ্ধি হবে অনেক ধীর। অভিবাসননির্ভর বৃদ্ধিই হবে তাদের টিকে থাকার প্রধান ভরসা। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা দেবে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো ঘনবসতিপূর্ণই থাকবে, তবে বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কমে আসবে। পাকিস্তান প্রায় অর্ধ বিলিয়নের কাছাকাছি পৌঁছালেও বাংলাদেশে জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৭৭ মিলিয়নে। ঘনত্বের চাপ কমবে না, বরং সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যাই হবে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা।
সব মিলিয়ে ২১০০ সালের পৃথিবী হবে এক বহুমাত্রিক বাস্তবতা। ভারত ও আফ্রিকা হবে উত্থানশীল শক্তি, চীন ও ইউরোপ হাঁটবে পতনের পথে, আর আমেরিকা থাকবে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষাকারী অবস্থানে। কিন্তু বড় প্রশ্ন থেকেই যাবে—১১ বিলিয়নের বেশি মানুষকে পৃথিবীর সীমিত সম্পদ ও নাজুক জলবায়ুর মধ্যে কীভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে?