
তাদের নাম কেউ জানে না। চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে থাকা তরুণটি প্রতিদিন সকালে একটি বিড়ির ধোঁয়ার সাথে তার দিনের সূচনা করে। পাশের রিকশাচালক, গ্যারেজের সহকারী, এমনকি পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কলেজ পড়ুয়া ছেলেটিও—তারা সবাই যেন এক অলিখিত বন্ধনে বাঁধা, যার নাম ‘ধূমপান’। দৃশ্যটা শুধুই কোনো নির্দিষ্ট এলাকার নয়, বরং গোটা বাংলাদেশের প্রতিদিনকার এক বাস্তবতা।
২০২৫ সালে World Population Review প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বের অনেক দেশেই ধূমপানের হার এখনও অত্যন্ত বেশি। শীর্ষ ১০টি ধূমপানপ্রবণ দেশের তালিকায় রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র নাউরু (৪৬.৭%), মিয়ানমার (৪২.৩%), সার্বিয়া (৩৯%), বুলগেরিয়া (৩৮.৮%), ইন্দোনেশিয়া (৩৮.৭%), পাপুয়া নিউ গিনি (৩৮.১%), ক্রোয়েশিয়া (৩৭.৬%), তিমোর-লেস্তে (৩৭.২%), কিরিবাতি (৩৬.৮%) এবং অ্যান্ডোরা (৩৬.৪%)।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধূমপানের ঊর্ধ্বগতির পেছনে রয়েছে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ। সিগারেট ও বিড়ির সহজলভ্যতা, তুলনামূলক কম দাম, তরুণদের মাঝে “ম্যাচো” (Macho) ভাব প্রকাশের প্রবণতা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষার ঘাটতি এই অবস্থার জন্য দায়ী। যদিও দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন রয়েছে, বাস্তবায়নের অভাবে সেটি কার্যকর হচ্ছে না। প্রকাশ্যে ধূমপানের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না, বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে।
ধূমপানের ভয়াবহতা শুধু পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; এর ফলাফল জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির উপর বড়সড় চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ধূমপানজনিত রোগে লক্ষাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যহানি শুধু পরিবারকেই নয়, রাষ্ট্রকেও ধীরে ধীরে নিঃস্ব করছে।
তবে এই ধূম্রছায়া থেকে বেরিয়ে আসার পথও রয়েছে—এবং কিছু দেশ তা দেখিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যে ২০০০ সালে ধূমপানের হার ছিল ৩৮ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ১৯.২ শতাংশে। এটি সম্ভব হয়েছে উচ্চ কর আরোপ, ধূমপানবিরোধী বিজ্ঞাপন প্রচার, তামাকপণ্যের প্যাকেটে সচেতনবার্তা, চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং কঠোর আইনের বাস্তবায়নের কারণে।
বাংলাদেশসহ তালিকাভুক্ত উচ্চ হারের দেশগুলো চাইলে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। প্রথমত, তামাকজাত পণ্যের কর বৃদ্ধির মাধ্যমে তা নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ধূমপানে নিরুৎসাহিত করতে সরকারকে আইনি কাঠামো আরও কঠোর করতে হবে এবং আইন প্রয়োগের জন্য আলাদা তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একইসঙ্গে, যারা ইতোমধ্যে ধূমপানে আসক্ত, তাঁদের জন্য চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সেবা সহজলভ্য করে পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
ধোঁয়ার এই অন্ধকার চক্র থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ যে রয়েছে, তা বিশ্বের উন্নত দেশগুলো প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের তরুণটি যে বিড়ির শেষ টানটা দিচ্ছে, হয়তো সে জানে না তার ফুসফুসে কী জমছে। কিন্তু রাষ্ট্র জানে। সমাজ জানে। এবং জানার দায় থেকেই এবার সময় এসেছে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার—নিজেকে, সমাজকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধোঁয়ার মৃত্যু থেকে বাঁচাতে।