
বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথে মুদ্রার শক্তি কিংবা দুর্বলতা একটি দেশের আর্থিক স্থিতি, রাজনৈতিক স্থায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের সক্ষমতার সূচক হিসেবে কাজ করে। ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়কালে বেশ কয়েকটি দেশের মুদ্রা ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওঠানামা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, দুর্নীতি, অতিমাত্রার মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এই দীর্ঘ সময়ে জিম্বাবুয়ের ডলার দুর্বলতম মুদ্রার তালিকায় প্রায় সর্বাগ্রে অবস্থান করেছে। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশটিতে এত তীব্র হারে মুদ্রাস্ফীতি হয়েছিল যে দৈনন্দিন বাজারে একটি রুটির দাম লাখো জিম্বাবুইয়ান ডলার পর্যন্ত গড়িয়েছিল। পরে সরকার বাধ্য হয়ে নিজস্ব মুদ্রা পরিত্যাগ করে মার্কিন ডলার ও দক্ষিণ আফ্রিকার র্যান্ড ব্যবহার শুরু করে। ভেনেজুয়েলার বলিভারও একই ধরনের সংকটে পড়েছিল। বিশেষ করে ২০১৩ সালের পর দেশটির রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও তেলের দামের পতনের ফলে মুদ্রাস্ফীতি কয়েক মিলিয়ন শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। জনগণের হাতে থাকা অর্থের মূল্য কার্যত কাগজের চেয়েও কম হয়ে পড়ে।
লেবাননের লিরা একসময় তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও ২০১৯ সালের পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও বৈদেশিক ঋণ সংকটের কারণে ভেঙে পড়ে। ২০২৪ সালের মধ্যে লেবাননের মুদ্রা বৈশ্বিক বাজারে অন্যতম দুর্বল অবস্থানে পৌঁছায়। সিরিয়ান পাউন্ডের অবস্থাও একই রকম, এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধ দেশটির অর্থনীতিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
আফ্রিকার আরও কয়েকটি দেশ যেমন সিয়েরা লিওন, কঙ্গো ও মালাউই তাদের মুদ্রার মান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। বিদেশি ঋণের চাপ, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও উৎপাদন খাতের দুর্বলতা এই দেশগুলোর অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দেয়। এশিয়ার মধ্যে ইরানি রিয়াল দীর্ঘদিন ধরেই অবমূল্যায়নের শিকার। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে সীমাবদ্ধতা রিয়ালকে ক্রমশ দুর্বল করেছে। মিয়ানমারের কিয়াতও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে বিপুল অবমূল্যায়নের মুখে পড়ে।
ইউরোপ মহাদেশে যদিও অধিকাংশ মুদ্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থেকেছে, তবে বেলারুশের রুবেল এবং কিছু পোস্ট-সোভিয়েত দেশগুলির মুদ্রা নানা সময়ে বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর নতুন স্বাধীন দেশগুলির অর্থনীতি দাঁড়িয়ে উঠতে না পারায় মুদ্রার মান দ্রুত অবনতি ঘটে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রাও ডলারের বিপরীতে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়েছে। তবে এটিকে বিশ্বে দুর্বলতম মুদ্রার তালিকায় ফেলা যায় না, কারণ এর অবমূল্যায়ন নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তানি রুপি ও শ্রীলঙ্কার রুপিও ভয়াবহ অবমূল্যায়নের মুখে পড়েছে। বিশেষত শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের ঋণ সংকট দেশটির মুদ্রাকে প্রায় অচল করে দিয়েছিল।
১৯৯০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে দুর্বলতম মুদ্রার তালিকা মূলত আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দখলেই থেকেছে। জিম্বাবুয়ে, ভেনেজুয়েলা, লেবানন, ইরান, সিরিয়া, সিয়েরা লিওন, মালাউই, সুদান কিংবা দক্ষিণ সুদানের মতো দেশগুলো বারবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আলোচনায় এসেছে। এসব মুদ্রার দুর্বলতা শুধু আর্থিক বাজারের ব্যর্থতা নয়, বরং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ, দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সালের ইতিহাস প্রমাণ করে যে মুদ্রার শক্তি কেবল অর্থনৈতিক উন্নতির ওপর নির্ভর করে না, বরং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, বৈদেশিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। দুর্বলতম মুদ্রাগুলোর গল্প আসলে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির সংকটের দলিল, যেখানে জনগণকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় দৈনন্দিন জীবনে অবমূল্যায়িত অর্থের বোঝা বয়ে।