
হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও শীতজনিত ফসলহানি কমাতে ‘ব্রি ধান-১১৮’ নামে স্বল্পমেয়াদি ও শৈত্য-সহনশীল নতুন বোরো ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। বিজ্ঞানীদের আশা, জাতটি হাওরাঞ্চলের কৃষকদের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখবে।
ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ উদ্ভাবিত নতুন এ জাতটি মূলত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকার কৃষকদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। হাওরে আগাম ধান রোপণ করলে শীতের কারণে ধানে ‘চিটা’ পড়ার আশঙ্কা থাকে। আবার দেরিতে রোপণ করলে ধান কাটার আগেই আকস্মিক বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ব্রির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান ড. খন্দকার মো. ইফতেখারউদ্দৌলা বলেন, ‘ব্রি ধান-১১৮’ স্বল্প জীবনকালের পাশাপাশি প্রজনন পর্যায়ে নিম্ন তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। ফলে আকস্মিক বন্যার আগেই কৃষকরা ধান কাটতে পারবেন এবং শীতজনিত চিটা পড়ার সমস্যাও অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
ব্রির তথ্য অনুযায়ী, ধানের প্রজনন পর্যায়ে টানা ৭ থেকে ১০ দিন গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকলেও এ জাতটি তা সহ্য করতে পারে। প্রচলিত অনেক জাতের ক্ষেত্রে এ সময় শীতের কারণে ধানের শীষে খালি দানা তৈরি হয় এবং ফলন কমে যায়।
স্বাভাবিক চাষাবাদে ব্রি ধান-১১৮ পরিপক্ব হতে ১৪৫ থেকে ১৫০ দিন সময় নেয়। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রোপণ করলে এপ্রিলের শুরুতেই ফসল কাটা সম্ভব। ফলে হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার আগেই ধান ঘরে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
ফলনের দিক থেকেও নতুন জাতটি আশাব্যঞ্জক। এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৬ দশমিক ৮ টন, যা জনপ্রিয় বোরো জাত ‘ব্রি ধান-২৮’-এর তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ১ টন বেশি। উন্নত ব্যবস্থাপনায় এ জাতের ফলন হেক্টরপ্রতি ৮ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত হতে পারে।
ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, হবিগঞ্জের প্রধান ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পার্থ সারথি বিশ্বাস বলেন, কয়েক বছরের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের মূল্যায়নে ‘ব্রি ধান-১১৮’ হাওরাঞ্চলে আশাব্যঞ্জক ফল দিয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতটি অবমুক্ত হওয়ায় এখনো ব্যাপকভাবে কৃষকদের কাছে পৌঁছেনি। কৃষকদের প্রতিক্রিয়া মূল্যায়নে আরও সময় প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
নতুন জাতটি দ্রুত কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে আগামী বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চলের ৫০টি উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার প্রদর্শনী প্লট স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে ব্রি। প্রতিটি উপজেলায় প্রায় ১০০টি করে প্লট থাকবে।
ব্রির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আগাম রোপণ করলে এ জাতের ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৬ টন এবং ১৫ থেকে ২০ নভেম্বরের মধ্যে রোপণ করলে প্রায় ৮ টন পর্যন্ত হতে পারে। নিম্ন তাপমাত্রাতেও দানার পূর্ণতা বজায় রাখায় এতে চিটা পড়ার হার তুলনামূলকভাবে কম।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, হাওরাঞ্চল দেশের মোট বোরো ধান উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ জোগান দেয়। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে গঠিত এ অঞ্চলে দেশের বার্ষিক ধান উৎপাদনের প্রায় ১৬ থেকে ২০ শতাংশ আসে।
নতুন জাতটি কৃষকদের মধ্যে দ্রুত সম্প্রসারণে ব্রি ২০২৬ সালের মে থেকে ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৮ মাসের একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এতে পাঁচ হাজার প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, পাঁচটি আঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে ৩০ টন মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও বিতরণ এবং প্রায় ৩ হাজার কৃষক ও ৪২০ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্রির বিজ্ঞানীদের আশা, ‘ব্রি ধান-১১৮’সহ জলবায়ু-সহিষ্ণু ধানের জাতের চাষ বাড়ানো গেলে হাওরাঞ্চলে ধান উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এতে আকস্মিক বন্যা ও শীতের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি কৃষকের আয় ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।