
সোমালিয়ায় তীব্র খাদ্যসংকট ও অপুষ্টির পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামী অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এল নিনো-জনিত ভারী বৃষ্টিপাত ও সম্ভাব্য বন্যায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তায় তহবিলের ঘাটতি সংকটাপন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির ফেডারেল সরকার ও জাতিসংঘ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এ বিষয়ে সতর্ক করেছে।
সর্বশেষ ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সোমালিয়ায় ৫৪ লাখ মানুষ সংকটপূর্ণ বা তার চেয়ে ভয়াবহ মাত্রার ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে। এদের মধ্যে ১৫ লাখ মানুষ জরুরি বা তার চেয়েও ভয়াবহ পর্যায়ের খাদ্যসংকটে থাকবে।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত দেশটিতে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১৯ লাখ ২০ হাজার শিশুর তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৩৩ হাজার শিশু মারাত্মক তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশটির অপুষ্টির প্রায় ৬২ শতাংশই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সম্ভাব্য বন্যার কারণে স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ব্যাহত হলে বেলেট ওয়েইন ও বাইদোয়ার বাস্তুচ্যুত মানুষের কিছু এলাকায় অপুষ্টির পরিস্থিতি আইপিসির সর্বোচ্চ সংকটপূর্ণ পর্যায় ৫-এ পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে বে অঞ্চলের বুরহাকাবা জেলায় তীব্র অপুষ্টির পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে সেখানে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি থাকলেও গু মৌসুমের বৃষ্টিপাত এবং মানবিক সহায়তা বাড়ানোর ফলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। অন্যদিকে, একই অঞ্চলের বাইদোয়া শহরে এখনো দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি রয়েছে। সেখানকার অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষ একদিকে তীব্র ক্ষুধা, অন্যদিকে অত্যন্ত সংকটপূর্ণ অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ মূল্যায়ন এপ্রিলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। নতুন তথ্য সংগ্রহ ও ঝুঁকি যাচাইয়ে আগামী অক্টোবরে ফলো-আপ মূল্যায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সোমালিয়ায় মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী জর্জ কনওয়ে বলেন, দেশটির মানবিক সংকট অত্যন্ত ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে। তীব্র ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে লাখ লাখ মানুষ ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। এল নিনো-জনিত বন্যা মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ও রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জীবন রক্ষা, প্রস্তুতি জোরদার এবং সংকটের আরও অবনতি ঠেকাতে জরুরি পদক্ষেপ ও অতিরিক্ত সম্পদ প্রয়োজন।

সোমালিয়া ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির (এসওডিএমএ) তথ্যমতে, সম্ভাব্য বন্যায় ২৫ থেকে ৩৫ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এ ছাড়া প্রায় ১০ লাখ মানুষ তাদের কৃষিজমি ও পশুচারণের এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের দেইর মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে গ্রামীণ নদীতীরবর্তী ও কৃষি-পশুপালননির্ভর জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বন্যায় ফসল ও গবাদি পশু নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বাজার, আয় ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে বহু পরিবার। এর ফলে নতুন করে বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও বাড়তে পারে।
এসওডিএমএর কমিশনার মহামুদ মোয়াল্লিম আবদুল্লাহি বলেন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টির অবনতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে সরকার গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় সরকার মানবিক সহায়তাকারী সংস্থা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণ, মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা এবং দুর্ভোগ কমাতে তিনি সহযোগী সংস্থা ও দাতাদের সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে সোমালিয়ার ফেডারেল সরকার ও জাতিসংঘ জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য ও নগদ সহায়তা এবং তীব্র ও মাঝারি অপুষ্টির চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি বন্যার কারণে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগেই গ্রামীণ ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় খাদ্য, পুষ্টিসামগ্রী ও জরুরি জীবিকা সহায়তা মজুদ এবং নগদ সহায়তা বিতরণের প্রস্তুতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে গ্রামীণ আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং পানি ও স্যানিটেশন সেবা সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মৌসুমি খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি এবং মৃত্যুহার পর্যবেক্ষণে ধারাবাহিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
সোমালিয়ায় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিনিধি এতিয়েন পিটারশমিট বলেন, ক্ষুধার সংকটে থাকা পরিবারগুলোর ফসল ও গবাদি পশু বন্যায় হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলায় জরুরি অর্থায়ন প্রয়োজন। আগাম সতর্কতাকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে পারলে জীবন বাঁচানো, জীবিকা রক্ষা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দ্রুত পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা সম্ভব।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সোমালিয়া প্রতিনিধি ও কান্ট্রি ডিরেক্টর হামিদ নুরু বলেন, দেশটির লাখ লাখ মানুষ খরা, নিরাপত্তাহীনতা ও খাদ্যের উচ্চমূল্যের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। অনেক পরিবার ইতিমধ্যে তাদের টিকে থাকার সম্পদ নিঃশেষ করে ফেলেছে। সম্ভাব্য বন্যার আগে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছানো এবং আগাম পদক্ষেপ গ্রহণে সংস্থাটি প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে কত পরিবারকে সহায়তা করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে এখন পাওয়া অর্থায়নের ওপর।
এদিকে জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সোমালিয়া প্রতিনিধি সান্ড্রা লাতৌফ জানান, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইউনিসেফ, সোমালিয়া সরকার ও অংশীদাররা যৌথভাবে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত ২২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি শিশুকে চিকিৎসা দিতে সহায়তা করেছে। তবে অর্থায়নের ঘাটতিতে এসব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়েছে। বছরের শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা অব্যাহত রাখা এবং যোগাযোগব্যবস্থা আরও সীমিত হওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের কাছে পুষ্টিসামগ্রী পৌঁছে দিতে জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।
সোমালিয়ায় জাতিসংঘ সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে পুষ্টি, স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন এবং খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে সমন্বিত সহায়তা জোরদার করছে। এ ক্ষেত্রে আইপিসির ফেজ ৪ বা তার চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং বেলেদওয়েইন ও বাইদোয়ার বাস্তুচ্যুত মানুষের বসতিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে অর্থায়ন নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, বন্যার কারণে পরিস্থিতির অবনতি শুরু হলে দুর্গত মানুষের কাছে সময়মতো খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না।
তথ্যসুত্র: ইউনিসেফ