
হাসান মাহমুদ: জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা মোকাবিলায় বর্তমানে সারা বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO₂) অপসারণের বিভিন্ন প্রযুক্তি। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভাবনাময় পদ্ধতিগুলোর একটি হলো ‘ওশান অ্যালকালিনিটি এনহ্যান্সমেন্ট’ (ওএই) বা সমুদ্রের ক্ষারত্ব বাড়ানোর প্রযুক্তি। কিন্তু সম্প্রতি এই প্রযুক্তি নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, সমুদ্রের পানিতে কার্বন শোষণের ক্ষমতা বাড়াতে গিয়ে যদি আমরা অতি-উৎসাহী হই, তবে তা পুরো প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করতে পারে। সম্প্রতি ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত ‘কোস্টাল অ্যান্ড এস্টুয়ারাইন কার্বন রিমুভাল টেকনিক ক্যান ব্যাকফায়ার হোয়েন পুশড টু ফার’ শিরোনামের গবেষণাপত্রে সমুদ্রের ক্ষারত্ব বাড়ানোর এই সীমাবদ্ধতাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণার প্রেক্ষাপট ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি:
এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন জর্জিয়া সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষক আমান্ডা বিট্রিজ মেলেন্দেজ-পেরেজ এবং তার বিশেষজ্ঞ দল। ওশান অ্যালকালিনিটি এনহ্যান্সমেন্ট বা ওএই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো সমুদ্রের পানির রাসায়নিক ভারসাম্যকে এমনভাবে পরিবর্তন করা, যাতে তা বায়ুমণ্ডল থেকে আরও বেশি পরিমাণ কার্বন (CO₂) শোষণ করে দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয় করতে পারে। সাধারণভাবে সমুদ্র প্রাকৃতিকভাবেই বিশ্বের অন্যতম বড় কার্বন সিঙ্ক হিসেবে কাজ করে। এই প্রযুক্তিটি মূলত প্রকৃতিকে একটু ‘সহায়তা’ করার চেষ্টা করে—সমুদ্রে চুনাপাথর বা খনিজ ক্ষারীয় পদার্থ যোগ করে সমুদ্রের অম্লতা বা অ্যাসিডিটি কমিয়ে আনা হয়, যাতে এটি বায়ুমণ্ডল থেকে আরও কার্বন শোষণ করতে পারে।
গবেষণায় গবেষকরা দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রের পানিতে বিভিন্ন মাত্রায় চুনাপাথর থেকে পাওয়া ক্যালসিয়াম কার্বনেট যোগ করে এর রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল—কার্বন অপসারণের জন্য কতটুকু খনিজ উপাদান যোগ করা নিরাপদ এবং এর ‘সুইট স্পট’ কোথায়।
গবেষণার ফলাফল:
গবেষণায় দেখা যায়, সমুদ্রের পানি প্রাকৃতিকভাবে কার্বন শোষণের যে ক্ষমতা রাখে, তাতে অ্যালকালিনিটি বা ক্ষারত্ব বাড়িয়ে সেই ক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব—এটি তাত্ত্বিকভাবে সঠিক। কিন্তু বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে পরীক্ষার মাধ্যমে এমন একটি ‘রাসায়নিক সীমা’ বা ‘থ্রেশহোল্ড’ আবিষ্কার করেছেন, যা অতিক্রম করলে পুরো প্রযুক্তিটিই বিপরীতমুখী আচরণ করতে শুরু করে।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যখন অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম কার্বনেট পানিতে যোগ করা হয়, তখন সেটি আর দ্রবীভূত থাকতে পারে না। ক্যালসিয়াম কার্বনেটের অতি-সম্পৃক্ততার কারণে তা দ্রুত কঠিন খনিজ কণায় পরিণত হতে থাকে, যাকে রসায়নের ভাষায় বলা হয় ‘প্রেসিপিটেশন’ বা অধঃক্ষেপণ। এই প্রক্রিয়ায় উল্টো কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক আমান্ডা বিট্রিজ মেলেন্দেজ-পেরেজ স্পষ্টভাবে বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি কার্বন অপসারণের আশায় আমরা যদি অনেক বেশি ক্ষারীয় পদার্থ যোগ করি, তবে তা হিতে বিপরীত হয়। এই কঠিন খনিজ কণাগুলো কেবল কার্বন ধরে রাখার উদ্দেশ্যই ব্যাহত করে না, বরং এটি সমুদ্রের পানিকে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়।’
এস্টুয়ারাইন বা মোহনার পানির বিশেষ ভূমিকা:
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল নদীর মোহনা বা এস্টুয়ারাইন পানির মিশ্রণ। পরীক্ষায় দেখা গেছে, পরিশোধিত সমুদ্রের পানির তুলনায় প্রাকৃতিক নদীর পানির সঙ্গে এর মিশ্রণ এই প্রযুক্তিকে অনেক বেশি স্থিতিশীল করতে পারে।
গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কমপক্ষে ৬০ শতাংশ প্রাকৃতিক নদীর পানির মিশ্রণ থাকলে খনিজ অসামঞ্জস্যতা অনেক কমে আসে। এর কারণ হিসেবে গবেষকরা জানিয়েছেন, নদীর পানিতে বিদ্যমান জৈব পদার্থ এবং খনিজ উপাদানগুলো সমুদ্রের পানির রসায়নের সাথে মিলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা তৈরি করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, এই প্রযুক্তির প্রয়োগ কেবল খোলা সমুদ্রের পানিতে করা ঠিক হবে না, বরং একে উপকূলীয় অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং লবণের ঘনত্বের সাথে সমন্বয় করে প্রয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব:
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিশাল উপকূলীয় এলাকা এই গবেষণার জন্য একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি ক্ষেত্র হতে পারে। বাংলাদেশের নদীগুলো প্রচুর পরিমাণে পলি এবং খনিজ উপাদান বঙ্গোপসাগরে নিয়ে আসে। আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জলজ পরিবেশের রাসায়নিক ভারসাম্য পরিবর্তন করছে। এই ‘থ্রেশহোল্ড’ তত্ত্বটি বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি বাংলাদেশ ভবিষ্যতে নিজস্ব সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় কার্বন ক্রেডিট অর্জন বা পরিবেশ রক্ষার কোনো বড় প্রকল্প গ্রহণ করে, তবে এই গবেষণার ফলাফলসমূহ মাথায় রাখা আবশ্যক। আমাদের নদীর মোহনাগুলোতে যে মিষ্টি ও নোনা পানির মিশ্রণ ঘটে, তা সম্ভবত কার্বন অপসারণ প্রযুক্তিকে প্রকৃতিগতভাবেই স্থিতিশীল রাখার সুযোগ দিচ্ছে। তবে কোনো প্রকার অপরিকল্পিত প্রজেক্ট গ্রহণের আগে মোহনার ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থানকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
বাস্তুসংস্থান ও অণুজীবের ওপর প্রভাব:
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, কেবল বায়ুমণ্ডলের কার্বন কমানোর নেশায় আমরা যেন সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের অপূরণীয় ক্ষতি না করি। সমুদ্রের ক্ষুদ্রতম অণুজীব, যেমন—প্লাঙ্কটন, ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জলজ প্রাণের ওপর অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম কার্বনেট বা ক্ষারীয় উপাদানের প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে এখনই আরও নিবিড় গবেষণার প্রয়োজন। এই অণুজীবগুলো কার্বন চক্রের প্রধান চালিকাশক্তি। এদের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হলে সমুদ্রের সামগ্রিক জৈব উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেতে পারে।
গবেষণাটি বিশ্বনেতাদের জন্য এক কঠোর সতর্কবার্তা। পরিবেশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কোনো একমুখী বা ‘ওয়ান সাইজ ফিটস অল’ সমাধান কাজ করবে না। প্রতিটি ভৌগোলিক অঞ্চলের নিজস্ব রসায়ন, আবহাওয়া এবং বাস্তুসংস্থান অনুযায়ী প্রযুক্তি সাজাতে হবে।