
দীর্ঘদিন ইলিশের দেখা না মিললেও উপকূলীয় জেলা ভোলার নদ-নদীতে এখন জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ ধরা পড়ছে। এতে জেলেপাড়ায় শুরু হয়েছে উৎসবের আমেজ। দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে জেলেদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি ও আশার আলো। একই সঙ্গে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে মাছঘাট ও ইলিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যেও।
জেলেরা জানান, মেঘনা, তেঁতুলিয়া, ইলিশা, কালাবাদর ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীসহ ভোলার বিভিন্ন নদীতে আগের তুলনায় বেশি ইলিশ ধরা পড়ছে। বর্তমানে জালে ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। শুক্রবার রাত থেকে অনেক জেলের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ায় তাদের ব্যস্ততাও বেড়েছে।
শনিবার দুপুর ১২টা থেকে সোয়া ১টা পর্যন্ত জেলা সদর ভোলার মেঘনা নদীর শিবপুর মাছঘাট, ইলিশা, তুলাতুলি ও ভেদুরিয়াসহ তেঁতুলিয়া নদীর কয়েকটি মাছঘাট সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ইলিশ সংরক্ষণ, কেনাবেচা এবং পরিবহনে জেলে, আড়তদার, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ব্যস্ততা বেড়েছে।
এসব ঘাটে জেলে মালেক মাঝি, শরিফ, মাইনউদ্দিন, কালাম ও ছিডু মাঝির সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, শুক্রবার রাত থেকেই নদীতে তাদের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। দীর্ঘদিন পর কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাওয়ায় তাদের মুখে হাসি ফুটেছে।
জেলেরা বলেন, এভাবে ইলিশ ধরা পড়তে থাকলে তারা ধারদেনা পরিশোধ করতে পারবেন এবং দীর্ঘদিনের লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন। নদীতে ইলিশের বিচরণ আরও বাড়লে সামনে আরও বেশি ও ভালো মানের মাছ পাওয়ার আশা করছেন তারা।
ভোলা সদরের ইলিশা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. বাদশা মিয়া বলেন, এতদিন ইলিশ না পাওয়ায় তারা খুবই হতাশ ছিলেন। ইলিশ সরবরাহের চুক্তির বিপরীতে ঢাকার মোকামের মালিকদের কাছ থেকে স্থানীয় আড়তদাররা লাখ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়েছিলেন। কিন্তু ইলিশ দিতে না পারায় সবাই দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এখন নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ায় তারা আনন্দিত।
জেলার সাগরপাড়ের চরফ্যাশনের সামরাজ মৎস্য বন্দর, মনপুরা, হাজিরহাট, রামনেওয়াজ, পঁচা কোড়ালিয়া ও কলাতলী মাছঘাটেও প্রচুর ইলিশ কেনাবেচার খবর পাওয়া গেছে।
তবে ইলিশের সরবরাহ বাড়লেও দাম এখনো কমেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মনপুরা মৎস্য আড়ত মালিক সমিতির নেতা আমির হাওলাদার বলেন, বর্তমানে ১ কেজি ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার ৭০০ টাকা, ৮০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং ৫০০ গ্রামের ইলিশ ৭০০ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে।
জেলা সদর ভোলা ও আশপাশের জেলাগুলোর আড়তেও ইলিশের দামে এমন ওঠানামা রয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ব্যবসায়ীরা। তবে ইলিশের ব্যাপক প্রাপ্তি অব্যাহত থাকলে আগামী দুই-চার দিনের মধ্যেই দাম ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে চলে আসবে বলে আশা করছেন মৎস্য সংশ্লিষ্টরা।
ভোলার মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলার নদী থেকে ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার থেকে ১ লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টন। গত অর্থবছরে জেলায় ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জন ভালো থাকায় চলতি বছরে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসাইন বলেন, বর্তমানে ইলিশের মৌসুম চলছে। এখন থেকে নদী ও সাগরে যেভাবে ইলিশ ধরা পড়ছে, তা অব্যাহত থাকলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।
জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ভোলায় সরকার নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার। তবে নিবন্ধিতদের বাইরে অনিবন্ধিত ও বেসরকারি জেলেও রয়েছেন, যাদের সংখ্যা ২ লাখের বেশি।
উল্লেখ্য, নদীতে জাটকা ও মা ইলিশ ধরায় দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে প্রণোদনার আওতায় ভোলার ৯০ হাজার ২১৩ জন নিবন্ধিত জেলেকে ভিজিএফের খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল দেওয়া হয়। এছাড়া ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কর্মহীন আরও ১৩ হাজার ৬০০ জেলেকে বিশেষ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়।