মানবসৃষ্ট এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশের দক্ষিণ জনপদের গুরুত্বপূর্ণ শহর বরিশাল। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শহরটি প্রতি বছর গড়ে প্রায় পৌনে ২ মিলিমিটার করে নিচে দেবে যাচ্ছে, যা আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অত্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করছে। কোথাও কোথাও এই দেবে যাওয়ার পরিমাণ এক ইঞ্চি পর্যন্তও পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।
ভূমি দেবে যাওয়ার ফলে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ভবন হেলে পড়া, দেয়ালে ফাটল এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র জলাবদ্ধতা, যা এখন নগরবাসীর নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি বরিশাল শহরের বৌদ্ধপাড়া, বিএম কলেজ এলাকা, বটতলা ও করিম কুটিরসহ একাধিক এলাকায় বহুতল ভবন হেলে পড়ার ঘটনা সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব পরিবর্তন খালি চোখে বোঝা না গেলেও স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণে ভূমি দেবে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর এবং জার্মানির ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর জিওসাইন্স যৌথভাবে বরিশাল এলাকায় ছয় বছরব্যাপী গবেষণা চালায়। ওই গবেষণাতেই শহরের ভূমি ধসে যাওয়ার এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নিয়ন্ত্রণহীন ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনই এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। শহরের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভূ-স্তরের ভারসাম্য নষ্ট করছে, যার ফলে মাটির নিচে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে উপরের মাটি দেবে যাচ্ছে।
এই প্রভাব শুধু শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং পাশের অন্তত ১০টি ইউনিয়নেও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে কৃষিজমিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং উৎপাদন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এবং অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) যৌথভাবে বরিশাল মহানগরী ও আশপাশের ১০টি ইউনিয়নে জরিপ পরিচালনা করে। ওই জরিপে দেখা যায়, শুষ্ক মৌসুমে মহানগরীতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায় প্রায় ৪৫ ফুট নিচে।
অন্যদিকে সদর উপজেলার জাগুয়া, কড়াপুর, কাশিপুর, চরবাড়িয়া ও চরকাউয়া ইউনিয়নে পানির স্তর নেমে যায় প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত। এতে সাধারণ মানুষকে পানির চাহিদা পূরণে গভীর নলকূপ ও সাবমারসিবল মোটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সমন্বয়কারী রফিকুল ইসলাম বলেন, বরিশাল শহরে বর্তমানে ৭৫ হাজারেরও বেশি নলকূপ রয়েছে। এসব নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির গভীর স্তর থেকেও পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে ভূগর্ভে ব্যাপক শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং সেই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে উপরের মাটি ধীরে ধীরে দেবে যাচ্ছে।
অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি নূরুল হাসান স্বাক্ষর বলেন, একসময় বরিশাল শহরে অসংখ্য খাল ও জলাশয় ছিল। কিন্তু সেগুলো ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যা এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বরিশাল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইমরান তরফদার জানান, আগে ৭০০–৮০০ ফুট গভীর নলকূপেই নিরাপদ পানি পাওয়া যেত। কিন্তু এখন অনেক এলাকায় ১০০০ থেকে ১১০০ ফুট গভীরে নলকূপ বসাতে হচ্ছে।
নগর প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় সারফেস ওয়াটার প্ল্যান্ট স্থাপন, পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা এবং মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটি দেবে যাওয়ার হার আপাতদৃষ্টিতে ধীর মনে হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে বরিশাল শহর বসবাসের জন্য গুরুতরভাবে অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে, যা একটি বড় নগর বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করছে।


