
বিশ্বব্যাপী ধূমপান কমছে, তবে তামাক মহামারি এখনো শেষ হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র (ডব্লিউএইচও) করা এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০০ সালে বিশ্বে তামাক ব্যবহারকারী ছিলেন প্রায় ১.৩৮ বিলিয়ন; ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে প্রায় ১.২ বিলিয়নে। অর্থাৎ, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রতি পাঁচ প্রাপ্তবয়স্কের একজন এখনও তামাক বা নিকোটিনজাত পণ্যে আসক্ত।
২০১০ সাল থেকে তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা মোট প্রায় ১২০ মিলিয়ন কমেছে- আপেক্ষিকভাবে প্রায় ২৭% হ্রাস। তবে এই অগ্রগতি সত্ত্বেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এখনও বিশাল ফাঁক রয়ে গেছে। ডব্লিউএইচও বলছে, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে অর্জিত অগ্রগতি আছে, কিন্তু নতুন নিকোটিন পণ্য এবং তরুণদের লক্ষ্য করে আগ্রাসী বিপণন সেই অর্জনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস বলেন, “বিশ্বজুড়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ তামাক ছেড়েছে বা শুরুই করেনি। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলো এখন নতুন নিকোটিনজাত পণ্য দিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে, তরুণদের লক্ষ্য করে আগ্রাসী বিপণন করছে। সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আরও দ্রুত ও শক্তভাবে কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।”
প্রথমবারের মতো ডব্লিউএইচও ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংয়ের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, যা উদ্বেগজনক। বর্তমানে বিশ্বে ১০ কোটিরও বেশি মানুষ ই-সিগারেট ব্যবহার করছে। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারী অন্তত ৮.৬ কোটি- যাদের অধিকাংশ উচ্চ আয়ের দেশে বাস করে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী অন্তত ১.৫ কোটি কিশোর-কিশোরী ইতিমধ্যেই ই-সিগারেট ব্যবহার করছে। যেসব দেশে তথ্য পাওয়া গেছে, সেখানে শিশুদের ভ্যাপিংয়ের হার প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় গড়ে প্রায় নয় গুণ বেশি।
ডব্লিউএইচও’র স্বাস্থ্য নির্ধারক, প্রচার ও প্রতিরোধ বিভাগের পরিচালক ড. এতিয়েন ক্রুগ বলেন, “ই-সিগারেট নতুন প্রজন্মকে নিকোটিনে আসক্ত করছে। এগুলোকে ‘ক্ষতি কমানো’ হিসেবে বাজারজাত করা হলেও বাস্তবে শিশু-কিশোরদের নিকোটিনের ফাঁদে ফেলে দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তামাক নিয়ন্ত্রণের অর্জনকে বিপন্ন করছে।”
২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পুরুষ ও নারী উভয় শ্রেণির মধ্যেই তামাক ব্যবহার কমেছে। তবে নারীরা এই পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ২০২০ সালেই তারা ২০২৫ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্য (৩০ শতাংশ হ্রাস) অর্জন করে। ২০১০ সালে নারীদের মধ্যে তামাক ব্যবহার ছিল ১১%, যা ২০২৪ সালে নেমে এসেছে ৬.৬ শতাংশে। এ সময়ে নারী তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৭.৭ কোটি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২০.৬ কোটিতে।
অন্যদিকে, পুরুষদের মধ্যে অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর। বর্তমানে বিশ্বের মোট তামাক ব্যবহারকারীর মধ্যে চারজনের বেশি পুরুষ, মোট প্রায় ১ বিলিয়ন পুরুষ এখনো তামাক ব্যবহার করছে। ২০১০ সালে পুরুষদের তামাক ব্যবহারের হার ছিল ৪১.৪%, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩২.৫%। বর্তমান এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পুরুষদের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে আরও সাত বছর সময় লাগবে, অর্থাৎ ২০৩১ সাল পর্যন্ত।
অঞ্চলভিত্তিক চিত্র
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: একসময় তামাক ব্যবহারের ‘হটস্পট’ ছিল এই অঞ্চল, কিন্তু ২০০০ সালের ৭০% থেকে ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশে। বিশ্বব্যাপী তামাক হ্রাসের অর্ধেক অবদান এসেছে এখান থেকেই।
আফ্রিকা: ২০২৪ সালে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে কম, মাত্র ৯.৫%। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ব্যবহারকারীর মোট সংখ্যা এখনো বাড়ছে।
আমেরিকা: এই অঞ্চলে ৩৬% আপেক্ষিক হ্রাস দেখা গেছে, বর্তমানে তামাক ব্যবহার ১৪%।
ইউরোপ: এখন এটি তামাক ব্যবহারের সর্বোচ্চ অঞ্চল- ২৪.১% প্রাপ্তবয়স্ক তামাক ব্যবহার করে। নারীদের মধ্যে এ হার সর্বোচ্চ, ১৭.৪%।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল: ১৮% প্রাপ্তবয়স্ক তামাক ব্যবহার করে, কিছু দেশে এখনো হার বাড়ছে।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল: ২০২৪ সালে ২২.৯% প্রাপ্তবয়স্ক তামাক ব্যবহার করছে, ২০১০ সালের ২৫.৮% থেকে সামান্য হ্রাস। নারীদের হার মাত্র ২.৫%, তবে পুরুষদের হার সর্বোচ্চ ৪৩.৩%।
সংস্থাটি সকল সরকারকে তামাক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এমপাওয়ার প্যাকেজ ও ডব্লিউএইচও ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন, শিশুদের লক্ষ্য করে তামাক ও নিকোটিন শিল্পের বিপণন বন্ধ করা, নতুন নিকোটিন পণ্যের নিয়ন্ত্রণ, কর বৃদ্ধি, বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধকরণ এবং তামাক ছাড়ার সহায়তা সেবা সম্প্রসারণ।
ডব্লিউএইচও-এর সহকারী মহাপরিচালক জেরেমি ফারার বলেন, “বিশ্বের প্রায় ২০% প্রাপ্তবয়স্ক এখনো তামাক বা নিকোটিন পণ্য ব্যবহার করছে। আমরা এখনই থামতে পারি না। কিছু অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু আরও দ্রুত ও শক্ত পদক্ষেপই একমাত্র উপায় এই মহামারি জয় করার।”
‘ডব্লিউএইচও গ্লোবাল রিপোর্ট অন ট্রেন্ডস ইন প্রিভালেন্স অফ টোবাকো ইউজ ২০০০-২০২৪ অ্যান্ড প্রজেকশনস ২০২৫-২০৩০’- শীর্ষক প্রতিবেদনের ভিত্তি ২,০৩৪টি জাতীয় জরিপের ওপর, যা বিশ্বের ৯৭% জনসংখ্যাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রতিবেদনটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি টার্গেট ৩.এ) ও ডব্লিউএইচও’র এনসিডি অ্যাকশন প্ল্যানের অগ্রগতি পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে তামাক ব্যবহারে ৩০% হ্রাস; এখন পর্যন্ত হ্রাস ২৭%, অর্থাৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখনো ৫ কোটি ব্যবহারকারী বেশি রয়ে গেছে।