
চট্টগ্রাম বিভাগের সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে ব্র্যাককে ১০ কোটি টাকা দিচ্ছে এইচএসবিসি বাংলাদেশ। এ অর্থে সাত মাসের পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে ব্র্যাক। এর আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ও স্কুল মেরামত, জীবিকা ও কৃষি কার্যক্রম পুনরুদ্ধার এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা পুনর্বাসন করা হবে।
রোববার (৩০ আগস্ট) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য মানবিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপচয় ও দুর্নীতি রোধে সরকার, বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোর সমন্বয়ে একটি অংশীদারত্বভিত্তিক মডেল গড়ে তোলা হচ্ছে। যেকোনো দুর্যোগে সরকার সবসময় ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ হিসেবে জরুরি সহায়তা দিয়ে থাকে। তবে পরবর্তী সময়ে শিক্ষা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তাসহ দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের বৃহত্তর কাজগুলো অংশীদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগের পরও যে শূন্যস্থানগুলো থাকে, এইচএসবিসি ও ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এসে তা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই সম্মিলিত উদ্যোগই একটি সফল পুনর্বাসন কার্যক্রমের চাবিকাঠি।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান বলেন, তাদের কাজ শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যেসব মানুষের সঙ্গে তারা কাজ করেন, তাদের পাশে থাকাও দায়িত্ব। এই উদ্যোগে ব্র্যাকের সঙ্গে কাজ করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি, জীবিকা ও প্রয়োজনীয় সেবা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় পরিবারগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোও লক্ষ্য।
ব্র্যাকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি, ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন কর্মসূচির পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী বলেন, দুর্যোগের সময় ব্র্যাক তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবন ও জীবিকা পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা ও সহনশীলতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা, জীবিকা এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে সহায়তা দেওয়া হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ প্রকল্প বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন ও জীবিকা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করেন তিনি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা, পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে বিভাগের ১০টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যায় ১০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বহু ঘরবাড়ি, স্কুল, পানির উৎস, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পুনর্বাসন সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করছে।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে এইচএসবিসি বাংলাদেশের অর্থায়নে সাত মাসের পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে ব্র্যাক। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
প্রকল্পের আওতায় ৫০টি বন্যাকবলিত স্কুল মেরামত ও পুনর্বাসন করা হবে এবং ১০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি ২৫০টি ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামত বা পুনর্নির্মাণ, ৪০০টি ক্ষতিগ্রস্ত পারিবারিক ল্যাট্রিন মেরামত বা পুনর্নির্মাণ এবং ৩০টি ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ মেরামত ও পুনর্বাসন করা হবে।
এ ছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ৩০০টি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে। ৬০০টি কৃষক পরিবারকে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ দেওয়া হবে, যাতে তারা আবার কৃষিকাজ শুরু করতে পারে।
কার্যক্রমে নারীপ্রধান পরিবার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি থাকা পরিবার, প্রবীণ, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীসহ বেশি ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ঘরবাড়ি, জীবিকা, শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের মতো জরুরি প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে দুর্যোগ মোকাবিলায় পরিবারগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক স্বরূপ কুমার চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। এছাড়া এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান এবং ব্র্যাকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি ও ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন কর্মসূচির পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী উপস্থিত ছিলেন।