
বাজারের প্রচলিত প্রসাধন বা স্কিনকেয়ার পণ্যগুলোর স্বাস্থ্যঝুঁকি যাচাই করতে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ ‘Yuka’ (ইউকা) এবং ‘Think Dirty’ (থিংক ডার্টি)-এর মতো জনপ্রিয় স্ক্যানার অ্যাপগুলোর ওপর ভরসা করেন। কিন্তু সম্প্রতি এক গবেষণায় এই অ্যাপ দুটির কার্যপদ্ধতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক রিসার্চ ডেস্ক’-এর এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে স্কিনকেয়ার অ্যাপ ‘ইউকা’ ও ‘থিংক ডার্টি’-এর কার্যপদ্ধতি নিয়ে নতুন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষকদের মতে, প্রসাধন সামগ্রীর লেবেলে থাকা ক্ষতিকর বিষাক্ততা বা কেমিক্যাল চিহ্নিত করতে পারলেও এই অ্যাপগুলোর একটি বড় অন্ধ দিক রয়েছে—আর তা হলো কৃত্রিম পলিমার (মাইক্রোপ্লাস্টিক) শনাক্তকরণে ব্যর্থতা।
সাধারণ সচেতন ভোক্তারা যখন সুপারমার্কেট বা কসমেটিকস শপে কোনো পণ্য স্ক্যান করে ১০০-তে ১০০ বা একদম ‘ক্লিন’ সার্টিফিকেট পান, তখন তারা ধরে নেন পণ্যটি পুরোপুরি নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব। তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। কারণ, এই অ্যাপগুলো মূলত নির্দিষ্ট কিছু বিষাক্ততার মানদণ্ডে কাজ করে, যার সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।
ইউকা বনাম থিংক ডার্টি-এর কাজের ধরন:
দুটি অ্যাপ জনপ্রিয় হলেও তাদের স্কোরিং পদ্ধতিতে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ফরাসি অ্যাপ ইউকা কাজ করে ‘সবচেয়ে খারাপ উপাদানের’ নীতিতে। অর্থাৎ, একটি পণ্যে যদি ৩০টি ভালো উপাদান থাকে কিন্তু মাত্র একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান থাকে, তবে পুরো পণ্যের স্কোর মারাত্মকভাবে কমে যায়। বর্তমানে খাদ্য ও প্রসাধন মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ পণ্যের বিশাল ডেটাবেস রয়েছে ইউকা-র।
অন্যদিকে, থিংক ডার্টি অ্যাপটি মূলত ব্যক্তিগত পরিচর্যা ও প্রসাধন সামগ্রীর ওপর ফোকাস করে। এটি জিরো থেকে ১০ স্কেলে ‘ডার্টি মিটার’ স্কোর দেয়। এই অ্যাপটির একটি প্রবণতা হলো এটি প্রাকৃতিক উপাদানকে বেশি নিরাপদ মনে করে এবং সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর অনেক কৃত্রিম ফর্মুলেশনকেও কঠোরভাবে পেনাল্টি দেয়। তবে এর ক্যাটালগ তুলনামূলক ছোট হওয়ায় অনেক সময় কাঙ্খিত পণ্যের ক্ষেত্রে ‘নট ফাউন্ড’ দেখায়।
উভয় অ্যাপের সাধারণ ও বড় সীমাবদ্ধতা:
কসমেটিকস কেমিস্ট ও গবেষকদের মতে, এই অ্যাপগুলোর দুটি মূল পদ্ধতিগত দুর্বলতা রয়েছে। যেমন-
ঘনত্বের হিসাব না রাখা: একটি উপাদান পণ্যে ০.০১% মাত্রায় আছে নাকি ২০% মাত্রায় রয়েছে—এই অ্যাপগুলো তা বিবেচনা করে না। লেবেলে উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই কেবল ওয়াচলিস্টের সঙ্গে মিলিয়ে স্কোর দেওয়া হয়।
সংরক্ষণ ও ব্যাকটেরিয়া রোধকারী উপাদানকে ভুল বোঝা: অনেক সময় প্রসাধনীতে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ রোধে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়, যা তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দেয়। অথচ অ্যাপগুলো এগুলোকে সরাসরি নেতিবাচক হিসেবে গণ্য করে।
সবচেয়ে বড় ফাঁক:
নিবন্ধ ও গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই অ্যাপগুলো যে মাপকাঠিতে চলে, সেখানে সিন্থেটিক পলিমারের কোনো স্থান নেই।
ইউকা-র নির্ধারিত প্রধান পাঁচটি ঝুঁকি হলো: হরমোন বিঘ্নকারী উপাদান, অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান, ইরিট্যান্ট বা চর্মরোগ সৃষ্টিকারী উপাদান, কার্সিনোজেন (ক্যানসার সৃষ্টিকারী) এবং দূষণকারী উপাদান। কিন্তু অ্যাক্রিলেটস কপলিমার, নাইলন-১২, পলিইথিলিন কিংবা পিইটি-এর মতো প্লাস্টিক বা কৃত্রিম পলিমারগুলো জৈবিকভাবে নিষ্ক্রিয় (বায়োলজিক্যালি ইনার্ট)। অর্থাৎ, এগুলো ত্বকে তাৎক্ষণিক কোনো বিষাক্ততা বা বিষক্রিয়া তৈরি করে না।
এ কারণেই পলিমারগুলো এই অ্যাপগুলোর কোনো অ্যালার্ট ট্রিগার করে না। ফলে, একটি প্রসাধন পণ্য ইউকা বা থিংক ডার্টি-এর বিচারে সর্বোচ্চ স্কোর বা ‘ক্লিন’ সার্টিফিকেট পাওয়ার পরও আদতে সেটি পুরোটাই প্লাস্টিক বা সিন্থেটিক পলিমার দিয়ে তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
বিশ্লেষকদের মতে, এই অ্যাপগুলো মূলত ‘হ্যাজার্ড স্ক্যানার’ বা স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ণায়ক, কোনো ‘প্লাস্টিক স্ক্যানার’ নয়। তাই কোনো পণ্যের ভালো স্কোর দেখে সেটিকে ১০০% নিরাপদ বা প্লাস্টিকমুক্ত ভাবার কোনো কারণ নেই। খাদ্য বা প্রসাধনী কেনার সময় অ্যাপের স্কোরের পাশাপাশি পণ্যের উপাদানের তালিকা (ইনসি লিস্ট) নিজে পড়ে দেখা এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক উপাদানগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়াই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
পরিবেশগত রসায়ন ও প্রসাধন সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. মারিয়া রদ্রিগেজ, যিনি দীর্ঘকাল ধরে ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যে ব্যবহৃত রাসায়নিকের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন—তার মতে, ‘এই অ্যাপগুলো মূলত ‘হ্যাজার্ড স্ক্যানার’ বা স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ণায়ক, কোনো ‘প্লাস্টিক স্ক্যানার’ নয়। তাই কোনো পণ্যের ভালো স্কোর দেখে সেটিকে ১০০% নিরাপদ বা প্লাস্টিকমুক্ত ভাবার কোনো কারণ নেই।’
তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, খাদ্য বা প্রসাধনী কেনার সময় অ্যাপের স্কোরের পাশাপাশি পণ্যের উপাদানের তালিকা (ইনসি লিস্ট) নিজে পড়ে দেখা এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক উপাদানগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়াই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
তথ্যসূত্র: মাইক্রোপ্লাস্টিক রিসার্চ ডেস্ক (প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬)