পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু জীব আছে, যাদের অস্তিত্ব জানা গেলেও প্রকৃত পরিচয় আজও রয়ে গেছে অজানা। ডাইনোসরেরও বহু আগে, প্রায় ৪০ কোটি বছর আগে স্থলভাগে দাপিয়ে বেড়ানো তেমনই এক রহস্যময় জীব হলো প্রোটোট্যাক্সাইট। বিশাল আকৃতি আর অদ্ভুত গঠনের এই জীবকে এতদিন ছত্রাক বা লাইকেন বলে মনে করা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণা সেই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফলে বিজ্ঞানীদের সামনে আবারও উঠে এসেছে এক পুরোনো কিন্তু অমীমাংসিত প্রশ্ন-প্রোটোট্যাক্সাইট আসলে কী ছিল?
১৮৫৯ সালে প্রথম প্রোটোট্যাক্সাইটের জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়। শুরুতে বিজ্ঞানীরা একে পাইনজাতীয় কোনো প্রাচীন উদ্ভিদের কাণ্ড বলে মনে করেছিলেন। তবে পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, এর ভেতরে উদ্ভিদের মতো কোষ বা টিস্যু নেই; বরং রয়েছে অসংখ্য সরু টিউব বা নালিকার মতো গঠন, যা একে প্রচলিত উদ্ভিদ ধারণা থেকে আলাদা করে।
ছত্রাক নয়, সম্পূর্ণ নতুন কিছু?
দীর্ঘদিন ধরে প্রোটোট্যাক্সাইটকে ছত্রাক বা লাইকেন জাতীয় জীব হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু স্কটল্যান্ডের রেইনি অঞ্চল থেকে পাওয়া জীবাশ্ম নিয়ে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কোরেন্টিন লোরেনের সাম্প্রতিক গবেষণা সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সমসাময়িক ছত্রাকের জীবাশ্মে যেখানে ‘কাইটিন’ বা ‘গ্লুকান’-এর মতো জৈব উপাদানের উপস্থিতি থাকে, সেখানে প্রোটোট্যাক্সাইটে সেগুলোর কোনো চিহ্ন নেই। লোরেনের মতে, “এদের গঠন আধুনিক কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী বা ছত্রাক-কোনোটির সঙ্গেই মেলে না।”
প্রোটোট্যাক্সাইটের বৈশিষ্ট্য
উচ্চতা: প্রায় ৩০ ফুট
প্রস্থ: প্রায় ৬ ফুট
আকৃতি: ডালপালাহীন লম্বা স্তম্ভ বা পাইপের মতো
সময়কাল: আনুমানিক ৪২–৪৩ কোটি বছর আগে (সিলুরিয়ান–ডেভোনিয়ান যুগ)
বিজ্ঞানীদের সংশয় রয়ে গেছে
তবে এই গবেষণাকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে মানতে নারাজ অনেক বিশেষজ্ঞ। প্যারিসের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের অধ্যাপক মার্ক-আন্দ্রে সেলোস বলেন, প্রোটোট্যাক্সাইটের অন্তত ২৫টি প্রজাতির অস্তিত্ব ছিল। মাত্র একটি প্রজাতির জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে পুরো গোত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
ফলে কয়েক কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই দানবীয় জীব আসলে কী ছিল, তা এখনও বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি। প্রোটোট্যাক্সাইট কি বিবর্তনের ধারায় একেবারে আলাদা কোনো প্রাণের শাখা ছিল, যা সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখনও গবেষণায় মুখিয়ে আছেন বিজ্ঞানীরা।


