
টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচী ২০২৫ এর সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতে আজ বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর ২০২৫) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে একটি সভার আয়োজন করা হয়। ইপিআই, ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী) অধ্যাপক ডা. মোঃ সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই টিকা নিরাপদ ও কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি শিশুর জন্য টাইফয়েড টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি দেশব্যাপী এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব জনাব মোঃ সাইদুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. মোঃ আবু জাফর, ইউনিসেফ বাংলাদেশের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ দীপিকা শর্মা, এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আইভিডি টিম লিড ডা. সুধির যশি। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর এবং সিটি কর্পোরেশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
কর্মসূচির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন ইপিআই অ্যান্ড সারভিলেন্স এর উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ। তিনি জানান, ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ক্যাম্পেইন ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। লক্ষ্য ৪ কোটি ৯০ লাখ শিশুকে টিসিভি (TCV) টিকা প্রদান করা হলেও DHIS2 অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫৩ শিশু। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন বিভাগে ১ কোটি ৫০ লাখ ৫৪ হাজার ৬৫ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক অর্জনের মধ্যে রয়েছে: চট্টগ্রাম ৩,৭৮৪,৭৫৮, ঢাকা ২,৯৯২,১৭৩, রাজশাহী ১,৯৮৪,১৮৮, রংপুর ১,৭২৯,৭০১, খুলনা ১,৫২৭,৩০৪, ময়মনসিংহ ১,১৩০,৯১০, সিলেট ১,০১০,১৫০, বরিশাল ৮৯৪,৮৮১
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৯০ লক্ষ মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয় এবং ১ লক্ষ ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ ২০২১-এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ওই বছর প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয় এবং ৮ হাজার মৃত্যু ঘটে, যার বেশিরভাগই শিশুরা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, টাইফয়েড টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ, WHO অনুমোদিত এবং সৌদি আরব হালাল সেন্টার কর্তৃক হালাল হিসেবে স্বীকৃত। এটি শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং টাইফয়েডের গুরুতর জটিলতা রোধ করে। বাংলাদেশ TCV টিকা জাতীয় কর্মসূচিতে যুক্ত করা সপ্তম দেশ।
যদিও কর্মসূচিটি সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ইপিআই কর্মসূচিতে মোট জনবলের প্রায় ৪০ শতাংশ শূন্য পদ, টিকা সরবরাহে মাঝে মাঝে ঘাটতি, নগর এলাকায় জনবল সংকট, সঠিক তথ্যের অভাব ও নজরদারির ঘাটতি উল্লেখযোগ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শূন্যপদ পূরণ, কোল্ড চেইন ব্যবস্থা জোরদার, বাজেট দ্রুত অনুমোদন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যাপকভাবে ব্যবহার ও জনসচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়।
বর্তমান সরকার টিকা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে ১,৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং ২৪ জেলায় নতুন কর্মী নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে টিকা ঘাটতি দূর হয়ে কার্যক্রম আরও নির্বিঘ্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গুজব ও ভুল তথ্যের প্রসঙ্গ তুলে বক্তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচিকে সফল করতে সবার সহযোগিতা অপরিহার্য।
অনুষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা প্রদান করেন ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন এবং ডা. রিয়াদ মাহমুদ, হেলথ ম্যানেজার, ইউনিসেফ বাংলাদেশ। শিক্ষক, গবেষক, এনজিও প্রতিনিধি ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। স্বাগত বক্তব্য ও সঞ্চালনা করেন ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন পরিচালিত প্রকল্পের পলিসি অ্যাডভাইজার অধ্যাপক ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম।